হিটলারের ইহুদি নিধনযজ্ঞের কারন

Holocaust শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ holokaustos থেকে। আর holokaustos শব্দটি গঠিত গ্রিক শব্দ hólos (whole) এবং kaustós (burnt) একসাথে মিলে। হলোকাস্ট বলতে বুঝায় একটি জেনোসাইড বা গণহত্যাকে। ইতিহাস খ্যাত এ গণহত্যায় হিটলারের নাৎসি জার্মান বাহিনী ও এদের দালালদের হাতে নিহত হয় ৬০ লাখ ইহুদি। এ ছাড়া এ গণহত্যার সময় আরো ৫০ লাখ অ-ইহুদিকেও হত্যা করা হয় বলে ইতিহাসবিদেরা হলোকাস্টে নিহতের সংখ্যা ১ কোটি ১০ লাখের কথা উল্লেখ করে থাকেন। এই গণহত্যা যেমনি চলে জার্মানিতে, তেমনি চলে জার্মানির অধিকৃত দেশ বা ভূখণ্ডগুলোজুড়ে। আর এই হত্যাকাণ্ড চলে ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সময়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত।

ইহুদিদের এই গণহত্যার লক্ষ্যে পরিণত করে পরিকল্পিতভাবে তা ঘটানো হয়। এটি আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়মাপের গণহত্যা। ইউরোপের বিভিন্ন জাতি সম্প্রদায় ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে নিঃশেষ করে দেয়ার নাৎসি জার্মানির বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই গণহত্যা পরিচালিত হয়। জার্মান ব্যুরোক্র্যাসির সবগুলো শাখা এই গণহত্যার সাথে জড়িত ছিল। এরা এই গণহত্যায় আনুষঙ্গিক সহায়তা জুগিয়েছে। এই পরিকল্পিত গণহত্যার মাধ্যমে থার্ড রাইখ (হিটলারের আমলের জার্মানি এ নামেই পরিচিত ছিল) কার্যত পরিণত হয় একটি ‘জনোসাইড স্টেটে’। প্যারিশ (কাউন্টি বা জেলার অন্তর্গত যাজকীয় বিভাগ, যার নিজস্ব যাজক ও গির্জা আছে) চার্চগুলো ও ইন্টেরিয়র মিনিস্ট্রি সরবরাহ করে জন্ম রেকর্ড, যা থেকে জানা যায় কে ইহুদি ও কে ইহুদি নয়। পোস্ট অফিস সরবরাহ করে ডিপোর্টেশন ও ডিনেচারেলাইজেশন অর্ডার, ফিন্যান্স মিনিস্ট্রি বাজেয়াপ্ত করে ইহুদিদের সম্পত্তি, জার্মান প্রতিষ্ঠানগুলো ইহুদিদের চাকরিচ্যুত করে, এবং ডিজএনপ্রেঞ্চাইজড করে ইহুদি স্টকহোল্ডারদের।

জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইহুদিদের ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানায়। যেসব ইহুদি এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে এরই মধ্যে অধ্যয়নরত ছিল, তাদের ডিগ্রি দিতেও অস্বীকার করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইহুদি শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত করা হয়। সরকারের পরিবহন বিভাগ ট্রেনের ববস্থা করে এদের ডিপোর্টেশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ওষুধ কোম্পানিগুলো ক্যাম্পে বন্দীদের ড্রাগটেস্ট করে। অনেক কোম্পানি ক্রিমেটোরিয়া তথা লাশ পোড়ানোর চুল্লি তৈরির দরপত্র দাখিলের প্রতিযোগিতায় নামে। ভিকটিমদের তালিকা তৈরিতে ব্যবহার হয় দেহম্যাগ (আইবিএম জার্মানি) কোম্পানির পাঞ্চকার্ড মেশিন। এর মাধ্যমে খুঁটিনাটি যাচাই করে তৈরি করা হয় হত্যাতালিকা। কোনো ইহুদিকে বন্দিশিবিরে ঢোকানোর সাথে সাথে তার সব ব্যক্তিগত সম্পদ জমা দিয়ে দিতে হয়। এসব সম্পদের ক্যাটালগ করে জার্মানিতে পাঠাতে হয় আবার ব্যবহার বা রিসাইকল করার জন্য।

সাউল ফ্রিডল্যান্ডার (জন্ম ১১ অক্টোবর, ১৯৩২) হচ্ছেন পুরস্কারবিজয়ী ইসরাইলি ইতিহাসবিদ ও বর্তমানে ইউসিএলের ইতিহাসের অধ্যাপক। তিনি লিখেছেন : জার্মানি ও ইউরোপের কোনো একটি সামাজিক গোষ্ঠী, একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী, পণ্ডিতদের কোনো একটি প্রতিষ্ঠান কিংবা পেশাজীবী সংগঠন সংহতি প্রকাশ করেনি ইহুদিদের প্রতি। তিনি আরো লিখেছেন, কিছু খ্রিষ্টান গির্জা ধর্মান্তরিত ইহুদিদের তাদের লোক বলে ঘোষণা করেছিল, তা-ও আবার একটা মাত্রা পর্যন্ত। ফ্রিডল্যান্ডার অভিমত দেন, এর ফলে হলোকাস্ট হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার। কারণ, অ্যান্টিসেমেটিক নীতির বাস্তবায়ন অবাধে চলে প্রতিরোধ শক্তির অবর্তমানেই।

নাৎসিদের এই গণহত্যার শিকার যেসব অ-ইহুদি তাদের মধ্যে আছে সাধারণ যাযাবর, রোমানি যাযাবর, পোল্যান্ডবাসী, কমিউনিস্ট, সমকামী, সোভিয়েত যুদ্ধবন্দী এবং মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী কিছু মানুষ। এদের নিয়ে সব মিলিয়ে এক কোটি ১০ লাখ মানুষ হলোকাস্টের শিকার। হলোকাস্টের আগে ইউরোপে ৯০ লাখ ইহুদি বসবাস করত। হলোকাস্টের ফলে এদের ৬০ লাখই নিহত হয়। জার্মানি ও জার্মানির অধিকৃত ভূখণ্ডের ৪২,৫০০ ফ্যাসিলিটির একটি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয় গণহত্যার শিকার লোকগুলোকে আটক ও হত্যার কাজে। হলোকাস্টের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সরাসরি জড়িত ছিল ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার লোক।

বন্দীদের নির্যাতন ও হত্যা সম্পন্ন করা হয় ধাপে ধাপে। প্রথমে জার্মান সরকার আইন পাস করে ইহুদিদের বেসামরিক সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য। এসব আইনের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত আইনটি হচ্ছে ১৯৩৫ সালের নুরেমবার্গ আইন। ১৯৩৩ সালে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়। আর ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে জনসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ইহুদিপাড়া তথা ঘেটো গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়। ১৯৪১ সালে যখন জার্মানি পূর্ব ইউরোপের নতুন নতুন ভূখণ্ড দখল করে নেয়, তখন Einsatzgruppen নামে বিশেষায়িত প্যারামিলিটারি বাহিনী ব্যবহার করে দুই লাখ ইহুদি ও রাজনৈতিক কর্মী হত্যা করা হয়। এ ক্ষেত্রে গণহারে গুলি করেও হত্যা করা হয়। ১৯৪২ সালের দিকে নিয়মিতভাবে এ ঘটনার শিকার লোকদের মালবাহী ট্রেনে করে এক্সটার্মিনেশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। পথেও অনেককে হত্যা করা হয়। বাকিদের গ্যাস চেম্বারে হত্যা করা হয়। এই হত্যা অভিযান ১৯৪৫ সালের এপ্রিলে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত চলে।

হলোকাস্ট চলার সময়ে ইহুদিদের সশস্ত্র প্রতিরোধও অব্যাহত ছিল। এমন একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে ১৯৪৩ সালের জানুয়ারিতে সংঘটিত ওয়ারশো ঘেটো অভ্যুত্থান। এ অভ্যুত্থানে সামান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ইহুদি প্রতিরোধকারীরা চার সপ্তাহ ধরে এরা নাৎসি বাহিনীকে কাছে যেতে দেয়নি। ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার ইহুদি রাজনৈতিক দলীয় লোক নাৎসি ও তাদের দালালদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। ফরাসি ইহুদিরাও সে দেশে বড় ধরনের সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। এরা নাৎসিদের ও ফরাসি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গেরিলা অভিযানও পরিচালনা করে। এ ধরনের সশস্ত্র ইহুদি অভ্যুত্থানের সংখ্যা একশটির মতো।

নীতিগত দিক
অন্যান্য জেনোসাইডে প্র্যাগমেটিক কনসিডারেশন বা প্রায়োগিক বিবেচ্য হয় কোনো দেশ বা ভূখণ্ডের কিংবা সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মতো কিছু বিষয়। ইসরাইলি ইতিহাসবিদ ও পণ্ডিত ইয়াহুদ বাউয়ারের অভিমত হচ্ছে : হলোকাস্টের মৌলিক প্রণোদনা পুরোপুরি আদর্শগত, এর শেকড় নাৎসিদের কাল্পনিক অলীক জগৎ (ইলিউশনারি ওয়ার্ল্ড অব নাজি ইমাজিনেশন), যেখানে ধরে নেয়া হয়েছিল একটি আন্তর্জাতিক ইহুদি চক্রান্ত চলছে পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করতে। আজ পর্যন্ত এ ধরনের সম্পূর্ণ মিথনির্ভর জেনোসাইড পৃথিবীতে আর একটিও দেখা যায়নি।

জামান ইতিহাসবিদ এভারহার্ড জ্যাকেল ১৯৮৬ সালে লিখেন এই হলোকাস্টের একটি অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে : এর আগে কখনো কোনো দেশের সরকারি কর্তৃপক্ষ ও এর দায়িত্বশীল নেতা সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘোষণা করেননি যে একটি সুনিদির্ষ্ট জনগোষ্ঠীর সব বয়সের নারী-পুরুষ, শিশু অপ্রাপ্তবয়স্কদের যথাসম্ভব সমূলে নিঃশেষ করে দেয়া হবে। যেখানে সিদ্ধান্ত নেয়া সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, এ কাজে রাষ্ট্রের সম্ভাব্য সর্বশক্তি ব্যবহার করা হবে।

পরিকল্পিতভাবে কার্যত এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয় জার্মানির দখল করে নেয়া সব ভূখণ্ডের সব এলাকাজুড়ে যেখানে আজকের ইউরোপের ৩৫টি স্বাধীন দেশ অস্তিত্বশীল। এই হত্যাকাণ্ড সবচেয়ে ভয়াবহভাবে চলে মধ্য ও পূর্ব-ইউরোপে। ১৯৩৯ সালের দিকে সেখানে ছিল ৭০ লাখ ইহুদির বাস। সেখানে হত্যা করা হয় ৫০ লাখ ইহুদিকে। অধিকৃত পেল্যান্ডে হত্যা করা হয়েছিল ৩০ লাখ ও সোভিয়েত ইউনিয়নে ১০ লাখ ইহুদিকে। নেদারল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াাম, যুগোস্লাভিয়া ও গ্রিসে হত্যা করা হয় আরো হাজার হাজার ইহুদি।

১৯৪২ সালের ২০ জানুয়ারি নাৎসি জার্মানির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বার্লিনের শহরতলি ওয়ানসিতে একটি সম্মেলনের আয়োজন করে। এটি ওয়ানসি কনফারেন্স নামে পরিচিত। রাইখ মেইন সিকিউরিটি অফিস আয়োজিত এ সম্মেলনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ‘ফাইনাল সলিউশন অব দ্য জিউইস কুয়েশ্চান’ বাস্তবায়নে বিভিন্ন সরকারি ডিপার্টমেন্টের প্রশাসনিক নেতাদের মধ্যে সহযোগিতা নিশ্চিত করা। এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে জার্মানি অধিকৃত ইউরোপের বেশির ভাগ ইহুদিকে পোল্যান্ডে বিতাড়িত ও হত্যা করা হবে। এ সম্মেলনে অংশ নেয়া লোকদের মধ্যে ছিল বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিবর্গ, ফরেন অফিস, জাস্টিস, ইন্টেরিয়র ও স্টেট মিনিস্ট্রির সেক্রেটারিরা। এ সম্মেলনে গৃহীত Wannsee Protocol এটি স্পষ্ট করে দেয়, নাৎসিরা চেয়েছিল ব্রিটেন ও ইউরোপের সব নিরপেক্ষ দেশ যেমন আয়ারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক, সুইডেন, পর্তুগাল ও স্পেনে ইহুদি প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে ফেলতে। যাদের রয়েছে তিন বা চার ইহুদি পূর্বপুরুষ বা গ্র্যান্ড পেরেন্ট, তাদেরকে অবশ্যই ব্যতিক্রমহীনভাবে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে হবে। অন্যান্য জেনোসাইডের ক্ষেত্রে মানুষ ধর্মান্তর কিংবা অন্যান্যভাবে আত্তীকৃত হওয়ার মাধ্যমে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল। তবে অধিকৃত ইউরোপের ইহুদিরা সে সুযোগ পায়নি, যদি না তাদের পূর্বপুরুষেরা ১৮৭১ সালের আগে ধর্মান্তরিত হয়ে না থাকেন। ইহুদি বংশের সবাইকে হত্যা করা হয় জার্মানির দখল করা ভূখণ্ডে।

 

এক্সটার্মিনেশন ক্যাম্প
এক্সটার্মিনেশন ক্যাম্প বা ইহুদি নিধনশিবিরগুলোর আরেক নাম ছিল ডেথক্যাম্প। নাৎসি জার্মানেরা এই ক্যাম্প গড়ে তুলেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯৩৯-৪৫)। এসব ক্যাম্পে লাখ লাখ ইহুদি হত্যা করা হতো প্রথমত গ্যাসচেম্বারে ঢুকিয়ে। তাদের প্রচুর কাজ করিয়ে ও একই সাথে খেতে না দিয়েও মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হতো। হলোকাস্টে ব্যবহার করা এক্সটার্মিনেশন ক্যাম্প বা ইহুদি নিধনশিবিরগুলোতে পরিকল্পিতভাবে ইহুদিদের নিধনের জন্য রাখা হয়েছিল গ্যাসচেম্বার। ইহুদিদের গণহারে গ্যাসচেম্বারে ঢুকিয়ে হত্যা করায় এটি ছিল এক অনন্য নির্মম উদাহরণ, যা ইতিহাসে এর আগে কখনো ঘটেনি। জনগণকে নির্বিচারে এভাবে হত্যার ঘোষিত উদ্দেশ্যের কথাও এর আগে কোথাও শোনা যায়নি। এসব এক্সটার্মিনেশন ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়েছিল অসউইট্জ, চেলমনো, জাসেনোবাক, মাজদানেক, মালি ট্রস্টেনেটস, সবিবর এবং ট্রেবলিঙ্কাতে।

 

মেডিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট
নাৎসিদের পরিচালিত ইহুদিনিধনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এদের ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয় মেডিক্যাল এক্সপেরিমেন্টে। অস্ট্রিয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকান রাজনীতিবিজ্ঞানী, হলোকাস্ট স্কলার ও ইতিহাসবিদ রাউল হিলবার্গ মনে করেন, অন্যান্য পেশাজীবীদের তুলনায় জার্মান চিকিৎসকদের বেশি চরম মাত্রায় নাজিফাইড করা হয়েছিল পার্টি মেম্বার করে। এরা বিভিন্ন এক্সটার্মিনেশন ক্যাম্পে মেডিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছিল ইহুদিদের ওপর। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অপরাধী চিকিৎসক ছিলেন ড. জোসেফ মেঙ্গেল। তিনি নিযোজিত ছিলেন অসউইট্জ ক্যাম্পে। তার পরীক্ষার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল ঘটনার শিকার ইহুদিদের প্রেসার চেম্বারে নিক্ষেপ করা, এদের ওপর ড্রাগ প্রয়োগ করা, ফ্রিজ করা, শিশুদের চোখে ইনজেকশন দিয়ে চোখের রঙ পরিবর্তন করে নানা পরীক্ষা চালানো এবং বিভিন্ন ধরনের অ্যামপুটেশন (শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে ফেলা) ও অন্যান্য নানা ধরনের সার্জারি। তার কাজের বিস্তারিত বিবরণ কখনোই পাওয়া যায়নি। কারণ, তার কাজের দলিলপত্র ট্রাকভর্তি করে পাঠানো হয় কাইজার উইলিয়াম ইনস্টিটিউটের ড. অতমার ভন ভার্স্চুয়েরের কাছে, যা ভার্সচুয়ের ধ্বংস করে ফেলেন। যেসব ইহুদি ড. মেঙ্গেলের মেডিক্যাল এক্সপেরিমেন্টের পরও বেঁচে ছিলেন তাদে সবাইকে পরে হত্যা করা হয় ও ব্যবচ্ছেদ করা হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য।

ড. মেঙ্গেল ব্যাপকভাবে মেডিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছিলেন রোমানি শিশুদের ওপর। তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই শিশুদের মিষ্টি ও চকোলেট দিয়ে এদের নিয়ে যেতেন গ্যাস চেম্বারে। শিশুরা তাকে ‘অঙ্কল (আঙ্কেল) মেঙ্গেল’ বলে ডাকত। ভেরা আলেক্সান্ডার নামে এক ইহুদি অসউইট্জ ক্যাম্পে থাকতেন, যিনি ৫০ জোড়া রুমানি যমজ শিশুর দেখাশোনা করতেন। তিনি বলেছেন, ‘বিশেষ করে একজোড়া যমজের কথা আমার মনে পড়ে। নাম গুইডু ও ইনা। এদের বয়স ছিল চার বছরের মতো। একদিন ড. মেঙ্গেল তাদের নিয়ে গেলেন। তাদের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। এদের একজনের সাথে আরেক জনকে যমজ শিশুর মতো সেলাই করে জুড়ে দেয়া হলো। এদের ঘায়ের ক্ষতে সংক্রমণ ঘটে। ক্ষতস্থান থেকে পুঁজ বের হচ্ছিল। এরা রাতদিন আর্তনাদ করত। আমার মনে আছে তাদের বাবা-মা কোনোমতে কিছু মরফিন জোগাড় করে তাদের সন্তানেদের এ যন্ত্রণা থেকে রেহাই দিতে নিজেরাই হত্যা করে। আমার মনে পড়ে এদের মায়ের নাম ছিল স্টেলা।’

 

বিরোধের সূত্রপাত ও কার্যকর
ইসরাইলি ইতিহাসবিদ ও পণ্ডিত ইয়াহুদ বাউয়ার এবং লুসি ডেভিডুইচ্জের মতে, মধ্যযুগের পর থেকে জার্মান সমাজে ও সংস্কৃতিতে সেমিটীয়-বিরোধিতা (হিব্রু, আরব, আসিরীয় ও ফিনিসীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি বিরোধিতা) ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যযুগের ইহুদিদের ওপর পরিচালিত নির্যাতন, হত্যা ও লুণ্ঠনকর্মের সাথে নাৎসি ডেথক্যাম্পগুলোর সরাসরি একটি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরিতে হাউস্টন স্টুয়ার্ট চেম্বারলেইন ও ডি লেগার্ডের মতো চিন্তাবিদেরা গড়ে তোলেন ঠড়ষশরংপয মুভমেন্ট। এই আন্দোলন উপহার দেয় এক বায়োলজিভিত্তিক জিওডিসায়েন্টিফিক রেসিজমের। এর মূল কথা হচ্ছে, কোনো কোনো মানবগোষ্ঠী অন্য মানবগোষ্ঠী থেকে জৈবিকভাবে বেশি মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া এতে ইহুদিদের দেখা হয় এমন একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে, যারা বিশ্বে প্রাধান্য বিস্তারের জন্য আর্যজাতিগোষ্ঠীর (জার্মান বা স্ক্যান্ডেনেভীয় জাতিগোষ্ঠীর) সাথে মরণযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। ভলকিশ্চ অ্যান্টিসেমিটিজ অনেকটা খ্রিষ্টানদের অ্যান্টিসেমিটিজমের ধাঁচেরই। কিন্তু পার্থক্যটা হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে ধর্মের চেয়ে বেশি টার্গেটে পরিণত করা হয় ইহুদি জাতিগোষ্ঠীকে।

১৮৯৫ সালের রিখস্ট্যাগের আগে দেয়া এক ভাষণে ভলকিশ্চ আন্দোলনের নেতা হারমান আহলওয়ার্দত ইহিুদিদের অভিহিত করেন ‘প্রিডেটর’ ও ‘কলেরা বেসিলি’ নামে। তার কথায়, জার্মান জনগণের স্বার্থে এদের ‘এক্সটার্মিনেটেড’ তথা ধ্বংস করে দেয়া উচিত। ১৯১২ সালের বেস্ট সেলিং বুক ডবহহ রপয ফবৎ কধরংবৎ ব্ধিৎ (ওভ ও বিৎব ঃযব কধরংবৎ)-এ ভলকিশ্চ গ্রুপ ‘অ্যালডিউটশ্চার ভারব্যান্ড’-এর নেতা হেনরিখ ক্লাস আহ্বান জানান সব জার্মান ইহুদিদের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নিতে হবে এবং তাদেরকে ‘অ্যালিয়েন স্ট্যাটাস’ ঘোষণা করতে হবে। হেনরিখ ক্লাস আরো আহ্বান জানান, জার্মানদের জনজীবনের সবকিছু থেকে ইহুদিদের বিচ্ছিন্ন করতে হবে এরা জমির মালিক হতে পারবে না, সরকারি পদে নিয়োগ পাবে না, সাংবাদিক হতে পারবে না, ব্যাংক ব্যবসায় করতে পারবে না এবং কোনো লিবারেল পেশায়ও যোগ দিতে পারবে না। ক্লাসের দেয়া সংজ্ঞা মতে, তিনিই ইহুদি যিনি ১৮৭১ সালে ‘জার্মান সা¤্রাজ্য’ ঘোষিত হওয়ার দিনটিতে ইহুদি ধর্মের অনুসারী ছিলেন, কিংবা এমন কেউ যার রয়েছে ইহুদি পূর্বপুরুষ বা গ্রান্ডপ্যারেন্ট।

ইহুদিদের ওপর প্রথম মেডিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট ও জাতিগত নিধনের ঘটনাটি জার্মানেরা ঘটায় জার্মান দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকার একটি ডেথক্যাম্পে, হারেরো ও নামাকোয়া জেনোসাইডের সময়। বলা হয়ে থাকে, এটি ছিল হলোকাস্টের একটি প্রেরণা। জার্মান সা¤্রাজ্যের সময়ে ভলকিশ্চ নোশন (ধারণা বা ভাবনাচিন্তা) ও জিওডোসায়েন্টিফিক রেসিজম জার্মানজুড়ে পেশাজীবী শিক্ষিত সমাজের মধ্যেও সাধারণ গৃহীত ব্যাপার হয়ে ওঠে। আশ্চর্য হতে হয়, জার্মান শিক্ষিত সমাজেও কী করে মানুষে মানুষে চরম বৈষম্যের এমন একটি নীতিকে আদর্শ হিসেবে গৃহীত হতে পার। ১৯১২ সালের রাইখস্ট্যাগ নির্বাচনে ভলকিশ্চ পার্টিগুলো পরাজিত হয়। এর পরও অ্যান্টিসেমিটিজম মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্ল্যাটফরমে ঢুকে পড়ে। ন্যাশনাল সোস্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি (নাৎসি পার্টি, এনএসডিএপি) ভলকিশ্চ প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯২০ সালে, যা ছিল ভলকিশ্চ আন্দোলনের একটি অফশুট তথা শাখামাত্র। এই নাৎসি পার্টি গ্রহণ করে ভলকিশ্চ আন্দোলনের অ্যান্টিসেমিটিজম নীতি। ১৯৩৩ সালের ১ এপ্রিলে স্টর্মট্রুপারেরা জাতীয়ভাবে ইহুদিদের ব্যবসায় বয়কটের আহ্বান জানায়। এরা ব্যানারফেস্টুন হাতে বার্লিনের সুপারমার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে জার্মানদের ইহুদি দোকানে ঢুকতে বাধা দেয়। ১৯৩৮ সালের দিকে এসে ইহুদিদের দোকানপাট ভাঙচুর ও তছনছ করে। আর এসব দোকান দিয়ে দেয়া হয় অইহুদি পরিরারগুলোকে।

নাৎসিরা ক্ষমতায় আসে ১৯৩৩ সালে। হিটলার খোলাখুলিভাবে ইহুদিদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে শুরু করেন। তার লেখা বই ‘মেইন কেম্প’-এ তিনি তার মনোভাবের সতর্কাভাষ দেন ইহুদিদের জার্মান রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক জীবন থেকে তাড়াতে হবে। তবে এ কথা লিখেননি, তিনি তাদের নিঃশেষ করে দেবেন। কিন্তু এমন খবর আছে, তিনি এদের নিঃশেষ করে দেয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবেই সুদৃঢ় ছিলেন। মেজর জুসেফ হেল সাংবাদিক থাকার সময় ১৯২২ সালের দিকে হিটলার তাকে বলেছিলেন, ‘আমি যদি কোনো দিন সত্যিসত্যিই ক্ষমতায় যাই, তবে আমার প্রথম ও সব কিছুর আগের কাজ হবে ইহুদিদের শেষ করে দেয়া।

মমসেনের মতে, জার্মানিতে তিন ধরনের অ্যান্টিসেমিটিজম ছিল : ০১. কালচারাল অ্যান্টিসেমিটিজম, যা দেখা যেত রক্ষণশীল জার্মানদের মধ্যে, বিশেষত সামরিক কর্মকর্তা ও বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষসারির কর্মকর্তাদের মাঝে; ০২. ভলকিশ্চ অ্যান্টিসেমিটিজম বা রেসিজম, এবং ০৩. রিলিজিয়াস অ্যান্টিজুডাইজম,যা দেখা যেত ক্যাথলিক গির্জাগুলোতে।

 

আইনি দমনপীড়ন ও প্রত্যাবাসন
থার্ড রাইখ প্রতিষ্ঠার ঠিক পর থেকেই নাৎসি নেতারা ঘোষণা দেন, ‘পিপলস কমিউনিটি’র অস্তিত্বের কথা। নাৎসি নীতিতে সমগ্র জনগোষ্ঠীকে দুই ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়: ন্যাশনাল কমরেডস এবং কমিউনিটি অ্যালিয়েন্স। নাৎসি নীতিতে দ্বিতীয় ক্যাটাগরির লোকদের তিন ধরনের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয় : র‌্যাসিয়েল এনিমি ইহুদি ও জিপসিদের এ ভাগে ফেলা হয় এদের রক্ত-বংশের কারণে; রাজ্যনৈতিক প্রতিপক্ষ যেমন মার্কসবাদী ও লিবারেলরা; এবং খ্রিষ্টান ও প্রতিক্রিয়াশীলেরা, যাদের মধ্যে রয়েছে সহজে বাগ না মানা ন্যাশনাল কমরেডস, কর্মবিমুখ মানুষ, অপরাধকর্মে অভ্যস্তরা ও সমকার্মীরাও। সবশেষ গ্রুপটিকে পাঠাতে হবে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ‘রি-এডুকেশনে’র জন্য। এরপর এরা ফিরে আসবে ‘ন্যাশনাল কমরেডস’ গ্রুপে। সংজ্ঞাসূত্রে ‘র‌্যাসিয়েল’ এনিমিরা অর্থাৎ ইহুদিরা কখনোই ‘ন্যাশনাল কমরেডস’ গ্রুপে আসতে পারবে না। এই ইহুদিদের সমাজ থেকে পুরোপুরি নির্মূল করতে হবে।

১৯৩০-এর দশকজুড়ে ইহুদিদের আইনি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার চরমভাবে সীমিত করা হয়। ইসরাইলি ইতিহাসবিদ সাউল ফ্রিডল্যান্ডার লিখেছেন, নাৎসিদের কাছে পবিত্র জার্মান মাটিতে নাৎসিদের বিশুদ্ধ রক্তই হচ্ছে তাদের শক্তির শেকড়।

 

দখল করা অন্যান্য দেশে
১৯৪০ সালে জার্মানি দখল করে নরওয়ে, নেদারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, বেলজিয়াম ও ফ্রান্স। ১৯৪১ সালে দখল করা হয় যুগোস্লাভাকিয়া ও গ্রিস। এসব দখল করা দেশেও ইহুদিবিরোধী পদক্ষেপ নেয়া হয়। যদিও এই পদক্ষেপের ব্যাপকতা ও মাত্রায় ভিন্নতা ছিল এসব দেশে। স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই ভিন্নতা ছিল। বিভিন্ন দেশের আইন অনুযায়ী ইহুদিদের ওপর বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিন্তু ১৯৪২ সালের আগে কোনো দেশ থেকে এদের বিতাড়নের ঘটনা ঘটেনি। ফ্রেঞ্চ স্টেট সরকারিভাবে দখলদার জার্মানিকে সহযোগিতা করেছে ফ্রান্সের ইহুদি নিধনে। জার্মানির মিত্র দেশ ইতালি, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া ও ফিনল্যান্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় ইহুদিবিরোধী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য। কিন্তু এসব দেশের মধ্যে বেশির ভাগ দেশই তা করতে রাজি হয়নি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ৯০০ ইহুদি ও ৩০০ রোমানের একটি দল বেলগ্রেডের ব্যানজিকা কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের কাছ দিয়ে চলে যায়, যারা প্রতিরোধ করেছিলেন জার্মান দখলদারিত্বের। এই কনসেনট্রেশন ক্যাম্পটি প্রাথমিকভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল সার্বিয়ান কমিউনিস্ট, রয়ালিস্ট ও অন্যান্য প্রতিরোধকারীদের জন্য। অপর দিকে ক্রোয়েশিয়ার জার্মান পুতুল সরকার সক্রিয়ভাবে সেখানে ইহুদি নিধনে নামে নিজস্ব উদ্যোগে। এ জন্য ১৯৪১ সালের ১০ অক্টোবরে স্বাধীন ক্রোয়েশিয়া ঘোষণা করে ‘লিগ্যাল ডিক্রি অন দ্য ন্যাশনালাইজেশন অব দ্য প্রপার্টি অব দ্য জিউস অ্যান্ড জিউস কোম্পানিজ’।

অন্যান্য দখল করা দেশেও চলে ইহুদি নিধন। উত্তর আফ্রিকায় বিপুলসংখ্যক আশকেনাজি বংশোদ্ভূত ইহুদি, শেফার্ডি ও মিজরাহি ইহুদি হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়। ১৯৩০-এর দশকে ফ্যাসিবাদী ইতালি সরকার ইহুদিদের সরকারি চাকরি ও স্কুলে প্রবেশের সুযোগ বন্ধ করে আইন পাস করে। আইনে আরো বলা হয়, এদের পাসপোর্টে ‘জিউইস রেস’ লেখা সিল মারতে হবে। তখন ইতালীয় লিবিয়ার ত্রিপোলির মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশই ছিল ইহুদি। সেখানে ছিল ৪৪টি সেনাগগ। ১৯৪২ সালে নাৎসিরা দখল করে বেনগাজির ইহুদি কোয়ার্টার এবং সেখান থেকে ২ হাজার ইহুদিকে সরিয়ে নেয়া হয় নাৎসি শ্রমশিবিরে। যাদেরকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে তাদের এক-পঞ্চমাংশ ধ্বংস হয়ে যায়। লিবিয়াতে বেশ কয়েকটি বাধ্যতামূলক শ্রমশিবির খোলা হয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় শ্রমশিবিরটির নাম ছিল গিয়াডো ক্যাম্প। এতে রাখা হয়েছিল ২৬০০ ইহুদিকে, এদের মধ্যে ৫৬২ জন মারা যায় শারীরিক দুর্বলতা, ক্ষুধা ও রোগশোকে। ছোট ছোট শ্রমশিবির গড়ে তোলা হয়েছিল ঘেরিয়ান, জেরেন ও টাইগ্রিনায়।

উত্তর আফ্রিকার একমাত্র তিউনিসিয়াই সরাসরি নাৎসিদের দখলে এসেছিল। ১৯৪২ সালের নভেম্বরে নাৎসিরা সে দেশে পৌঁছে, তখন সেখানে ছিল ১ লাখ ইহুদি। নাৎসিরা সেখানে ছিল ছয় মাস। তখন এরা তিউনিসিয়ায় আরোপ করে ইহুদিবিরোধী নীতি। এদের বাধ্য করা হয়ে ‘হলুদ তারকা’ চিহ্নিত কাপড় পরতে। এদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। নানা ধরনের জরিমানা করা হয়। ৫ হাজার তিউনিশীয় ইহুদি বাধ্যতামূলক শ্রমের শিকার হয়। কিছু ইহুদিকে পাঠিয়ে দেয়া হয় ইউরোপের ক্যাম্পে। আড়াই হাজারেরও বেশি তিউনিসীয় ইহুদি মারা যায় দাসশিবিরে ৬ মাসের নাৎসি দখলসময়ে। ১৯৩৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জার্মান-সোভিয়েত চুক্তির মাধ্যমে লিথুয়ানিয়া বিনিময়ে জার্মানি লুবলিন এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। নিসকো প্ল্যান অনুযায়ী এরা এ এলাকায় গড়ে তোলে লুবলিন-লিপওয়া রিজারভেশন। এই রিজারভেশনের ডিজাইন করেন অ্যাডল্ফ আইখম্যান যাকে দায়িত্ব দেয়া হয় জার্মানি, অস্ট্রিয়া এবং বোহেমিয়া ও মোরাভিয়া প্রটেকটরেট থেকে সব ইহুদিদের অপসারণের। ১৯৪০ সালের ৩০ জানুয়ারির মধ্যে ৭৮ হাজার ইহুদিকে জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও চেকোস্লোভাকিয়া থেকে লুবলিনে পাঠানো হয়। ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি পমেরেনিয়ান ইহুদিদের পাঠানো হয় লুবলিন রিজারভেশনে।

 

শেষকথা
হলোকাস্টের ইহুদিনিধনের ইতিহাস সুদীর্ঘ। ইহুদিনিধনে এটি নাৎসিদের এক মহাযজ্ঞ। একটি মাত্র লেখায় এর বিস্তারিতে যাওয়ার কোনো অবকাশ নেই। তবে এটি নিশ্চিত, এটি যেমনি নাৎসি জার্মানদের জাতীয় কলঙ্ক, তেমনি এই অমানবিক হত্যাযজ্ঞ না ঠেকাতে পারাটাও গোটা মানবজাতির জন্য এক চরম ব্যর্থতা। বিশ্বে এ ধরনের আরো নানামাত্রিক জেনোসাইডের ঘটনার বেলায়ও একই কথা খাটে। তাই মানবজাতিকে এখন থেকে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন এ ধরনের ব্যর্থতার দায় যেন আর মাথায় নিতে না হয়।

আপনার মন্তব্য দিন

শেয়ার