সব দায়ভার কী মুশফিকের?

প্রতিটি ভালো কাজের পিছনে কারো না কারো অবদান থাকে। যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয় আধুনিক মালয়েশিয়ায় রূপকার কে- চোখ বুঁজে বলে দেবেন মাহাথির মোহাম্মদের নাম। ঠিক তেমনি বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নতির পিছনে যদি কয়েকটি নাম থাকে তার মধ্যে সংগঠক হিসেবে সাবেক সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী, বর্তমান সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন আর খেলোয়াড় হিসেবে চোখ বুজে বলে দেয়া যাবে মাশরাফি বিন মর্তুজা, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহীম ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের নাম।

 

সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২ ম্যাচের টেস্টে সিরিজে দলের ভরাডুবি ও অধিনায়ক মুশফিকুর রহীমের কিছু মন্তব্যের জের ধরে গুঞ্জন উঠেছে অধিনায়কত্ব হারাতে যাচ্ছেন মুশফিক। কাঠগড়ায় মুশফিক একা কেন? এই দায়ভার কী কোচ, নির্বাচকম-লি, ও বোর্ড-কর্তাদের উপর বর্তায় না? যদি দল ভাল করে তারা বাহবা নেবেন আর খারাপ করলে কাঠগড়ায় শুধুমাত্র অধিনায়ক কেন উঠবেন!

 

এই সিরিজে দলে ছিলেন না অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান, ২য় টেস্ট ইনজুরির কারণে ছিলেন না তামিম ইকবাল। তার ওপর প্রায় অচেনা কন্ডিশন। যদি বলা হয়, পেশাদার খেলোয়াড়রদের কন্ডিশনের দোহাই দেয়া মানায় না, তাহলে বাংলাদেশে এসে অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ডের পরাজয়ের জন্য তো কাউকে আধিনায়কত্ব হারাতে হয়নি। বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। দীর্ঘ ৯ বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বাংলাদেশ, তার ওপর অপরিহার্য খেলোয়াড়টি দলের বাইরে- এ বিষয়গুলো কী ক্রিকেট বোদ্ধাদের মাথায় নেই?

 

যদি বাংলাদেশের টেস্টে সবচেয়ে সফল অধিনায়ক বলা হয় তাহলে মুশফিকের নাম বলতে হবে। আমরা ওয়ানডেতে ধারাবাহিক হওয়ার কক্ষপথে আছি। টেস্টে নিজেদের মাটিতে জিততে শুরু করেছি, এখন প্রয়োজন বিদেশের মাটিতে নিজেদের জাত চেনানো। এমন একটি সময়ে সবার উচিত খেলোয়াড়দের পাশে থাকা। হয়তো এই সিরিজের ফলাফল এর চাইতে ভাল কিছু হতে পারত, কিন্তু তা হয়নি কেন তার কারণ খুঁজতে হবে। অন্যথায় খেলোয়াড়েরা তাদের মনোবল হারাতে পারে। ক্রিকেট দলীয় খেলা, তবে ব্যর্থতায় দায় অধিনায়কের দিকে আসতেই পারে। তাই বলে সব দোষ কারো একার ঘাড়ে চাপিয়ে সমাধানের পেথ খোজা সম্ভব নয়।

 

দুই টেস্টেই টসে জিতে ফিল্ডিং নেয়ার কারণে ব্যাপক সমালোচনায় পড়তে হয়েছিল মুশফিককে। সংবাদ সম্মেলনে সেটার দায় মুশফিক চাপিয়েছিলেন টিম ম্যানেজমেন্টের উপর। অন্যদিকে দেশে থেকে মুশফিকের সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। একথা সত্য যে, মিডিয়ার সামনে কথা বলার ক্ষেত্রে মুশফিক হয়তো আরো দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারতেন।

 

কে জানে, ডিসেম্বরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হোম সিরিজে অধিনায়ক হিসেবে তাকে দেখা যাবে কিনা। তবে বোর্ডের উচিত দেশে আসার পর অধিনায়ক মুশফিক ও কোচ চন্ডিকা হাথুরাসিংহের সাথে আলোচার মাধ্যমে এই সিরিজের ব্যর্থতার যথাযথ ময়না তদন্ত করা। তাতেই হয়তো বেড়িয়ে আসবে কল্যাণকর কোন পথ।

অধিনায়ক পাল্টানোর উদ্যোগ : নেপথ্যের হিসাব

বাংলাদেশ দলের হারা না যত আলোচনায়, তার চেয়েও ঢের বেশি সমালোচনা এখন মুশফিকের অধিনায়কত্বের প্রসঙ্গ নিয়ে। হঠাৎ করে কেন মুশফিকের অধিনায়কত্ব কেড়ে নেয়া হচ্ছে এমন রটনা। বিসিবি কেন এটা ফলাও করে প্রচার করলো একটা সিরিজ চলাকালে, এ নিয়েও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। সবার আগে দেখা উচিত ছিল দেশের ক্রিকেটের স্বার্থ। সিরিজের মাঝপথে দলের অধিনায়ক তার নেতৃত্ব হারাচ্ছেন এমন খবর প্রচার না করলেও হতো। সিরিজ শেষে বিসিবি এ ঘোষণা দিলে বোধহয় কথাটা উঠতো না।

সিরিজের মাঝে এমন ঘোষণায় দলের ক্রিকেটারদের ওপর আস্থা হারিয়েছেন অন্যরা। অধিনায়ক নিজেও নেতৃত্ব দিতে অস্বস্তি বোধ করেছেন। এতে ক্ষতিটা আসলে কার। বড় ক্ষতি হয়ে গেছে দেশের ক্রিকেটের। হারেরও একটা সীমারেখা আছে।

দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশ হেরেছে এক যুগ আগে যখন টেস্ট ম্যাচ খেলে হারতো ঠিক সেভাবে। প্রথম টেস্টে বাজে খেলে হারের পর দ্বিতীয় টেস্টে ঘুরে দাঁড়ানোর অভ্যাস আছে। শুধু জিতলেই ভালো রেজাল্ট নয়। লড়াইয়ে হারেও অনেক আত্মবিশ্বাস থাকে। কিন্তু ব্লুমফন্টেইনে বাংলাদেশ হেরেছে একেবারে অসহায় আত্মসমর্পণ করে। এমন পারফরম্যান্সের কারণে ঠিক আগের দুই সিরিজে যে বড় দু’টি জয় রয়েছে, শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দলকে হারানো, তা-ও ঢাকা পড়ে গেছে। সমালোচনার সময়ে ওই সাফল্যের কথা ভুলে যান যেন সবাই।

একজন অধিনায়ক হঠাৎ করেই বাজে পারফরম্যান্স করেন না। তার পারফরম্যান্স দুই ধরনের। একটা ব্যক্তিগত। আরেকটি দলগত। মুশফিক ব্যক্তিগতভাবে এ সিরিজে খারাপ করেছেন বটে। কাকতালীয়ভাবে দলগত পারফরম্যান্সও ছিল বাজে। এমন কিছু সিদ্ধান্ত তার মাধ্যমে বাধ্য করেছে টিম ম্যানেজমেন্ট, মুশফিক সেগুলো সম্ভবত কখনো চিন্তাও করেননি। এর মধ্যে তার দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতার কিপিংও একটি। কিপিং শেষের দিকে আর করতেন না কুমার সাঙ্গাকারা। অনেক দিন আগে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনও বলেছিলেন, ‘ওর ওপর চাপটা বেশি হয়ে যাচ্ছে। কিপিং, ব্যাটিং ও ক্যাপ্টেনসি। চাপটা তার জন্য বেশি হয়ে যায়।’

এর ধারাবাহিকতায় কিপিং থেকে তাকে মুক্তি দেয়া যেতেই পারে। এতে তার ব্যাটিংয়ে আরো বেশি মনোযোগ বেড়ে যাবে। এটা পজেটিভ দিক। কিন্তু একই সঙ্গে ক্যাপ্টেনসিও যদি কেড়ে নেয়া হয়, এটা তো তার আত্মসম্মানবোধে লাগারই কথা। তবে এটাও ঠিক, দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে মুশফিককে দিয়ে যদি না-ই হয়, তা হতে পারে। তার চেয়ে অন্য কাউকে দিলে যদি দলের পারফরম্যান্স ভালো হয়, তা অনেক পজেটিভ একটা দিকও। কিন্তু আগের সিরিজে অস্ট্রেলিয়াকে প্রচ রকম চেপে ধরে সিরিজ অল্পে জয় হাতছাড়া করল যে দল সে দলের অধিনায়ককে?

যদি বিসিবির হঠাৎ মনে হয়ে থাকে ক্যাপ্টেন পরিবর্তন আবশ্যক তা হলে তো একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা হতে পারে। সিরিজের মাঝপথে পরিস্থিতি তৈরি করা কেন? এর আগেও মাশরাফি বিন মর্তুজাকে টি-২০’র ক্যাপ্টেনসি থেকে সরে যেতে বাধ্য করে পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল। এবার মুশফিকের জন্যও তেমন পথে হাঁটার কী অর্থ থাকতে পারে।

মুশফিক নিজ থেকে চেয়ে নেননি টেস্ট দলের ক্যাপ্টেনসি। যখন তাকে ওই দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, মুশফিক ক্ষাণিকটা অপ্রস্তুতও ছিলেন। বিসিবির সিদ্ধান্ত অমান্য করেননি। সে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন এবং মুশফিকই একমাত্র অধিনায়ক, যার আমলে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি সাফল্য পেয়েছে। এমন এক অধিনায়ককে সম্মানের সাথে দায়িত্ব ছেড়ে দিতে বললে মুশফিক আপত্তি করতেন না। কিন্তু তা রেখে কেন তাকে অপমান করে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা হলো। কেন অধিনায়ক হওয়া সত্ত্বেও তাকে বাউন্ডারিতে ফিল্ডিং করতে নির্দেশনা দেয়া হলো। কেন টসে জিতে যাতে ফিল্ডিং নেয়া হয় সে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

মনোমালিন্য হতেই পারে। মুশফিক অধিনায়ক হিসেবে তারও একটা ভূমিকা থাকবে। চাওয়া-পাওয়া থাকবে। কারণ মাঠে পারফরম্যান্স করা ও সতীর্থদের কাছ থেকে পারফরম্যান্স বের করা থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষকে কিভাবে ঘায়েল করা যায় সে ছক তাকেই বাস্তবায়ন করতে হয়। মাঠের বাইরের সিদ্ধান্তে তাকে অকার্যকর রেখে তাকে যদি ভাঙা ঢাল-তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধে জয়ী হতে বলা হয়, তা তো মেনে নেয়ার মতো নয়। মুশফিক কেন, কেউই মানবে না এমনটাÑ দিনের পর দিন। এসব ক্ষেত্রে গুরুত্বটা অধিনায়কের চেয়ে যদি অন্য কারো বেশি হয়ে যায় তা হাস্যকর, নির্লজ্জতা ছাড়া আর কিছুই না। এতে শুধু মুশফিকই নন, ওই স্থানে যিনি আসবেন তার সঙ্গেও ঝামেলা চলবে, যাতে বড় ক্ষতি হতে থাকবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের। যেমনটা দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত দুই ম্যাচে হলো।

মুশফিকের অধিনায়কত্ব কেড়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি : পাপন

টেস্ট দলের অধিনায়কত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এখনো শুরু করেনি বলে জানান দিলেন সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। গতকাল গণমাধ্যমে তিনি বলেন,‘মুশফিকের অধিনায়কত্ব ছিনিয়ে নেয়ার ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’ কবে নাগাদ হতে পারে সেটাও তিনি জানাননি। তবে মুশফিকের কড়া সমালোচনা করেছেন বিসিবির এ সভাপতি। তিনি বলেন, সংবাদ সম্মেলনে এসে মুশফিক যে সমালোচনাগুলো করেছেন এতে দেশের ক্রিকেটের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ হয়েছে। টস নিয়ে কোনো অধিনায়ক সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের কথা বলতে পারেন না। এটা দলের জন্য ভালো হচ্ছে না।’ তিনি সমালোচনা করেন বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্স নিয়েও।

পাপন বলেন, ‘টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের বডি ল্যাংগুয়েজ দেখে মনে হয়নি তারা জেতার জন্য মাঠে নেমেছিল।’ মুশফিক প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, হয়তো তার সাথে কোচের কোনো সমস্যা যাচ্ছে বা টিম ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে। এটা তার নিছক ব্যক্তিগত ব্যাপার। যেহেতু এটা প্রকাশ হয়েছে, ফলে দেশে আসার পর এসব সমস্যার সমাধান হবে।’ পাপন আরো বলেন, ম্যাচে তিনি অধিনায়ক। তিনি কোথায় ফিল্ডিং করবেন সেটা তো তার নিজের ব্যাপার। তার ফিল্ডিং করার স্থান নির্ধারণ করে দেয়া টিম ম্যানেজমেন্টের ছিল না। সিদ্ধান্ত তার ব্যক্তিগত। তার ওপর বিষয়টা কেউ চাপিয়ে দেয়নি।’

উল্লেখ্য, অধিনায়ক হওয়া সত্ত্বেও কেন তিনি বাউন্ডারি লাইনে ফিল্ডিং করে গেছেন এটা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ অধিনায়ককে সবসময় বাঞ্ছনীয় উইকেট ও আম্পায়ারদের আশপাশে থাকা। এতে বোলিং পরিবর্তন ও বোলারকে সার্বক্ষণিক বুদ্ধি পরামর্শ প্রদান এবং সতীর্থদের উৎসাহ জোগাতে সুবিধা হয়। বাউন্ডারি লাইনে ফিল্ডিং করলে সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ এ কাজগুলো করা সম্ভব হয় না। এ ছাড়াও ওই ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন না সহ-অধিনায়ক তামিম ইকবাল। তাহলে ম্যাচটা কিভাবে পরিচালিত হলো? জবাবটা ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে দিয়েছেন তিনি নিজে।

জানিয়েছিলেন ম্যানেজমেন্টের ইচ্ছাতে বাউন্ডারি লাইনে ফিল্ডিং করতে বাধ্য হয়েছিলেন। উল্লেখ্য, দুই টেস্টেই টসে জিতেও ব্যাটিং উইকেটে ফিল্ডিং বেছে নেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। এ নিয়েও সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। একজন অধিনায়ক টস জিতলে কী করবেন সেটা মূলত ড্রেসিং রুমেই নেয়া হয়, ম্যানেজার ও কোচ অধিনায়ক মিলে। সিদ্ধান্তটা মুশফিকের একার ছিল না। যদিও এখন চাপানো হচ্ছে মুশফিকের ওপর। প্রথম টেস্টে ৩৩৩ রানে হারের পর দ্বিতীয় টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে বাংলাদেশ।

আপনার মন্তব্য দিন

শেয়ার