যে কারণে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা জরুরি !!

পৃথিবীতে কোনো মানুষের সন্তান হবে কি হবে না তা অনিশ্চিত। কিন্তু দুনিয়াতে মানুষসহ সব জীবের মৃত্যু সুনিশ্চিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ এ পৃথিবীর প্রত্যেক জীবের শেষ পরিণতি হলো মৃত্যু। এমনি করে একদিন এ পৃথিবীও ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন, ‘এ পৃথিবীতে সবকিছুই ধ্বংসশীল।’ (সুরা আর-রহমান : আয়াত ২৬)

যাকে সৃষ্টি না করলে আল্লাহ তাআলা কোনো কিছুই সৃষ্টি করতেন না। সেই প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনিও মৃত্যু বরণ করবেন এবং তারাও মরবে।’ (সুরা যুমার : আয়াত ৩০)

শুধু মানুষই নয় বরং পৃথিবীর কোনো কিছুরই চিরস্থায়ীত্ব নেই। পৃথিবীর প্রথম থেকে আজ অবদি কোনো জাতির জীবনকেই চিরস্থায়ীত্ব দেয়া হয়নি। আল্লাহ বলেন, ‘চিরন্তনতা তো তোমার পূর্বে কোনো মানুষের জন্য সাব্যস্ত করিনি। (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৩৪)

যে কারণে মৃত্যুকে বেশি স্মরণ করবেন

>> কুরআনে আল্লাহ তাআলা মৃত্যুকে একটি সুনিশ্চিত বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। আর একজন মুসলিমের জন্য করণীয় বিষয় হলো বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করা। সব সময় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা। দুনিয়ার জীবনেই পরকালের চিরস্থায়ী জীবনের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করা।

প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘পাঁচটি জিনিসকে পাঁচটি জিনিসের আগে মর্যাদা দেয়া। (যার প্রথমটিই হলো) তোমার জীবনকে মৃত্যুর আগে মর্যাদা দাও।’ (মুসনাদে আহমদ) এ কারণেই বেশি বেশি মৃত্যুর স্মরণ এবং মৃত্যুর প্রস্তুতি নেয়া দরকার।

>> কোনো মানুষই জানেনা তার হায়াত বা দুনিয়ার জীবন কতদিনের। এটি এমন এক গোপন রহস্য যে, সে কখন কোথায় কিভাবে মরবে তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আর তা জেনে কেউ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিবে সে সুযোগও কোনো মানুষের নেই। এ কারণেই সব সময় মৃত্যুর স্মরণ করা।

>> মৃত্যু এমন এক জিনিস; যা দমন বা প্রতিহত করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি তা থেকে পলায়ন বা তা পিছিয়ে দেয়াও সম্ভব নয়। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ রয়েছে। যখন তাদের মেয়াদ এসে যাবে, তখন তারা না এক মুহুর্ত পিছে যেতে পারবে, আর না সামনে অগ্রসর হতে পারবে। (সুরা আ’রাফ : আয়াত ৩৪)

>> মুমিনের মৃত্যুর সময় মৃত্যুর ফেরেশতা সুন্দর সুঘ্রাণ, রূপ ও আকৃতি নিয়ে আসে। তাঁর সঙ্গে থাকে রহমতের ফেরেশতা; যারা মুমিন ব্যক্তিকে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেন। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ; অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের জন্য প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ। (সুরা হামীম সিজদা : আয়াত ৩০)

>> আর যখন বেঈমানের কাছে মৃত্যুর ফেরেশতা ভীতিকর আকৃতি ও কালো চেহারায় আসে এবং তার সাথে থাকে আজাবের ফেরেশতা; যারা তাকে আজাবের দুঃসংবাদ দেয়।

আল্লাহ বলেন, ‘যদি আপনি দেখেন যখন জালেমরা মৃত্যু যন্ত্রণায় থাকে এবং ফেরেশতারা স্বীয় হাত প্রসারিত করে বলে, বের কর স্বীয় আত্মা! আজ তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি প্রদান করা হবে। কারণ, তোমরা আল্লাহর উপর অসত্য বলতে এবং তাঁর আয়াতের মোকাবিলায় অহংকার ও বিদ্রোহ করতে।’ (সুরা আনআম : আয়াত ৯৩)

>> মৃত্যুর আগে মানুষের ঈমানি কালেমার আকাঙ্ক্ষা ও প্রচেষ্টা থাকা কল্যাণের। প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মৃত্যুর আগে যার শেষ বাক্য হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’; সে জান্নাত লাভ করবে।’ (আবু দাউদ)

পরিশেষে…

মানুষের উচিত সব সময় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা। তা সংঘটিত হতে পারে যে কোনো সময়। আর মৃত্যুর সময় প্রতিটি মানুষই ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হয়। এমনি সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি ও মুমূর্ষু অবস্থায় এক মুমিনের প্রতি অপর মুমিনের দায়িত্ব কর্তব্য হলো ঈমানি কালেমার তালকিন দেয়া। আর নিষ্ঠাবান ব্যক্তি ছাড়া এ কালিমা উচ্চারণ করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।

এ কারণেই প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুমুখে পতিত ব্যক্তিকে কালিমা স্মরণ করে দিতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের মৃত্যুমুখে পতিত ব্যক্তিকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়তে বলো।’ (মুসলিম)

আল্লাহ তা্অলা মুসলিম উম্মাহকে দুনিয়ার জীবনে বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করে অন্যায় ও অপরাধমুক্ত জীবন লাভ করার তাওফিক দান করুন। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মৃত্যুর কথা স্মরণ ও মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের তাওফিক দান করুন। শেষ বিদায়ে ঈমান লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।

তন্দ্রা-ঘুমের সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্ক ও আল্লাহর গুণ !!

লা তা’খুজুহু সিনাতু ওয়া লা নাওম’-এ আয়াতাংশটি আল্লাহর একটি মহা গুণের বর্ণনা। যা আয়াতুল কুরসিতে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলা তন্দ্রা ও নিদ্রা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। আয়াতের আগের অংশে বলা হয়েছে। তিনি ‘ক্বাইয়্যুম’; জগতের সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকারী। সমগ্র সৃষ্টি তাঁর আশ্রয়ে পরিচালিত।

তাইতো আল্লাহ তাআলা বলেন, তাকে (আল্লাহ) তন্দ্রা এবং নিদ্রা স্পর্শ করতে পারে না। জগতের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনায় তাকে ক্লান্ত করে না। এ সব নিয়ন্ত্রণে তাকে বিশ্রাম নেয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। তিনি সব ধরনের দুর্বলতার উর্ধ্বে।

তন্দ্রা ও নিদ্রার মতো দুর্বলতা যে আল্লাহ তাআলাকে স্পর্শ করতে পারে না- এটি মহান প্রতিপালকের কুদরত এবং হেকমতেরই একটি উজ্জ্বল প্রমাণ।

মনে রাখতে হবে- তন্দ্রার সম্পর্ক হলো চোখের সঙ্গে এটি নবি-রাসুলদের ঘুম। আর নিদ্রার সম্পর্ক হলো কলবের সঙ্গে। যা প্রতিটির প্রাণীর ওপর অপরিহার্য হিসেবে চেপে বসে।

হজরত আবু মুসা আশআরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের এক মজলিসে দণ্ডায়মান অবস্থায় পাঁচটি কথা বলেছেন-
>> এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ তাআলার নিদ্রা নেই আর নিদ্রা তাঁর পবিত্র সত্তার যোগ্যও নয়।
>> তিনি আমল পরিমাপের পাল্লার রক্ষক। যার জন্যে ইচ্ছা তিনি তা নীচু করেন আর যার জন্য ইচ্ছা তাকে উপরে স্থাপন করেন।
>> তাঁর দরবারে (মানুষের) দিনের কার্য বিবরণী রাত আসার আগেই পেশ করা হয়।
>> আবার রাতের কার্য বিবরণী দিন আসার আগেই পেশ করা হয়।
>> তাঁর আবরণ হলো নূর। যদি এ নূরের আবরণ সরিয়ে দেয়া হয়; তবে তাঁর জামালের নূর সেই সব সৃষ্টিকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাঁই করে দিবে; যার প্রতি তাঁর দৃষ্টিপাত হবে। (মুসলিম, তাফসিরে মাজহারি)

পৃথিবীতে যত ধর্মীয় মতবাদ রয়েছে; সব মতবাদের প্রবক্তারাই তন্দ্রা এবং নিদ্রার সঙ্গে জড়িত। শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলাই এ থেকে ব্যতিক্রম।

এমনকি ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানরাও তাদের প্রতিপালকের ব্যাপারে এ আকিদা পোষণ করেন যে, ‘আল্লাহ তাআলা ছয় দিনে আসমান এবং জমিন সৃষ্টি করেছেন। সপ্তম দিনে তাঁর বিশ্রামের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

কিন্তু ইসলাম এবং মুসলমানদের আকিদা সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ তাআলা নিজেই ঘোষণা করেন, ‘তিনি তন্দ্রা এবং নিদ্রা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে তাঁর এ গুণের ওপর পরিপূর্ণ আকিদা ও বিশ্বাস স্থাপন করে শিরকমুক্ত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ঋণ পরিশোধ করতে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার দোয়া!

মানুষ দুনিয়াবী প্রয়োজনে অভাবগ্রস্ত হয়ে ধার-দেনা বা ঋণ করে থাকে। অনেক সময় মানুষ দুনিয়াবি কারণবশত অথবা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণে প্রচণ্ড অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়ে। যার ফলে সে দেনাদারের ঋণ পরিশোধে অপারগ হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেনাদারের ঋণ পরিশোধ করতে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার জন্য হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে একটি দোয়া শিখিয়েছিলেন। যা তুলে ধরা হলো:

হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একদা তার নিকট এক ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি এসে বলে, আমি আমার ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম, আমাকে সাহায্য করুন! হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি কি তোমাকে এমন এক বাক্য শিখাব না? যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে শিখিয়েছেন। যদি তোমার ওপর পাহাড় পরিমাণ ঋণের চাপও থাকে, আল্লাহ তাআলা তা পরিশোধের ব্যবস্থা করে দিবেন। তুমি বলবে-

উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিক ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াক। (তিরমিজি, মিশকাত)

অর্থঃ ‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে হালালের সাহায্যে হারাম থেকে বাঁচাও এবং তোমার অনুগ্রহ দ্বারা তুমি ব্যতিত সকল কিছু হতে আমাকে অমুখাপেক্ষী করে দাও। অর্থাৎ তুমি ছাড়া যেন আমাকে আর কারো মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রয়োজন না হয়।

আল্লাহ তাআলা এ দোয়ার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে ঋণ পরিশোধ করার তাওফিক দান করুন।

আপনার মন্তব্য দিন

শেয়ার