বিচারক হিসেবে নবী করিম সা:

আখলাকুন্নবী সা: বা নবীচরিত্র একটি সামগ্রিক বিষয়। বিচারকার্যে নবীর চরিত্র বা আখলাক তারই একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজজীবন চালাতে গিয়ে তাদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহ ও বিবাদ-বিসংবাদ ঘটতে পারে। এর ফলে যাতে কোনো রকম সামাজিক ধ্বংস বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সেজন্য নবী করিম সা: বিচারকাজেও তার অনুপম আদর্শ রেখে গেছেন।

নবী করিম সা: বিচারক হওয়ার প্রকৃতি : পৃথিবীর চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী নবী করিম সা: কারো দ্বারা মনোনীত বিচারক ছিলেন না। তাঁকে বিচারক হিসেবে মনোনীত করেছিলেন স্বয়ং আহকামুল হাকিমিন আল্লাহ তায়ালা। আল কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে- ‘(হে নবী)! আমি সত্যসহকারে আপনার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি যাতে আপনি আল্লাহর দেখানো মুক্তির আলোকে বিচার-আচার করতে পারেন’ (সূরা নিসা, ১০৫)।

(হে নবী!) বলুন, আমি আল্লাহর নাজিল করা কিতাবের ওপর ঈমান এনেছি এবং তোমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে’ (সূরা শুরা, ১৫)। ‘অতএব হে নবী, আপনার রবের কসম তারা কখনোই মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তারা তাদের ঝগড়াবিবাদে আপনাকে বিচারক মানবে এবং আপনার সিদ্ধান্তের প্রতি মনে দ্বিধাসঙ্কোচ না রেখে সন্তুষ্টচিত্তে তা মেনে নেবে’ (সূরা নিসা, ৬৫)। এসব আয়াতে কারিমা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ সা: স্বনিয়োজিত বা কারো দ্বারা নির্বাচিত বিচারক ছিলেন না। তিনি ছিলেন মহান আল্লাহ কর্তৃক নিযুক্ত বিচারক আর বিচারক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব রিসালতের দায়িত্ব থেকে আলাদা ও বিচ্ছিন্ন ছিল না। তিনি রাসূল হিসেবে বিচারকও ছিলেন। রাসূলকে বিচারক হিসেবে না মানা মুমিনের কাজ নয়, বরং তা মুনাফিকের কাজ। আল কুরআনে বলা হয়েছে : ‘যখন তাদের বলা হয় আল্লাহর নাজিল করা কিতাব ও রাসূলের দিকে এসো, তখন দেখবে যে, মুনাফিকেরা তোমার থেকে কেটে পড়েছে’ (সূরা নিসা, ৬১)।

বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের নীতিমালা : সুষ্ঠুভাবে বিচারকাজ পরিচালনার জন্য বিচারককে অবশ্যই কতগুলো নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে, যার জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে নবী মুস্তাফা সা:। তিনি বিচারকাজে সর্বপ্রকার স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থাকতেন। তিনি বলতেন, আমার মেয়ে ফাতিমাও যদি চুরি করে তবে আমি নির্দ্বিধায় চুরির শাস্তি হিসেবে তার দু’হাত কেটে দেবো। তিনি সুস্থ মস্তিষ্কে বিচারকাজ পরিচালনা করতেন, যাতে করে কোনো পক্ষের প্রতি অবিচার না হয়ে যায়।

হাদিস শরিফে এসেছে- হজরত আবু বকর রা: বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সা:কে বলতে শুনেছি, তিনি বলতেন : রাগান্বিত অবস্থায় যেন কোনো বিচারক দু’জন বিবদমানের মধ্যে বিচার ফায়সালা না করেন’ (বুখারি, মুসলিম)।
হজরত বুরাইদা রা: বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন- বিচারক তিন প্রকার। এক প্রকার জান্নাতি আর দুই প্রকার জাহান্নামি। জান্নাতে প্রবেশ করবেন তিনি যিনি সত্য অবগত হয়ে সে মোতাবেক বিচারকাজ পরিচালনা করেন, আর যে ব্যক্তি জেনেশুনে অন্যায় ফায়সালা দান করেন বা সত্য না জেনে আন্দাজের ওপর বিচারকার্য পরিচালনা করেন, তারা উভয়েই জাহান্নামি’ (আবু দাউদ, ইবনে মাজা)।

‘বিচারকার্য পরিচালনার মূল ভিত্তি ও উপায়-উপকরণ হচ্ছে প্রথমত আল কুরআন, এরপর সুন্নাহ এবং সর্বশেষে কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে ইজতিহাদ বা গবেষণালব্ধ ফায়সালা।’

হজরত মুয়াজ বিন জাবাল রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: যখন তাকে ইয়েমেনে পাঠালেন, তখন বললেন, ‘কিভাবে তুমি বিচার-আচার করবে? মুয়াজ বললেন, আল কুরআনের ফায়সালা অনুসারে। হুজুর সা: বললেন, যদি ওই বিষয়ে আল কুরআনে কোনো ফায়সালা খুঁজে না পাও? মুয়াজ বললেন, সুন্নাহ দ্বারা। হুজুর সা: বললেন, যদি তাতেও না পাও? তিনি বললেন, আমার ইজতিহাদ দ্বারা এবং এতে কোনো প্রকার সঙ্কীর্ণতা দেখাব না। এরপর নবী করিম সা: হজরত মুয়াজের বুকে হাত রেখে বললেন, প্রশংসা সেই আল্লাহ তায়ালার যিনি তাঁর রাসূলের দূতকে এমন ক্ষমতা দান করলেন যাতে আল্লাহর রাসূল সন্তুষ্ট’ (তিরমিজি, আবু দাউদ, দারেমি)। বিচার-আচার করার সময় বাদি-বিবাদি উভয় পক্ষের কথাবার্তা যথাযথ শুনে এবং এর পক্ষে-বিপক্ষে সাক্ষী-প্রমাণ গ্রহণ করে ফায়সালা করা নবী করিম সা:-এর বিচারকার্যের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল।

হজরত আলী রা: বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ সা: ইয়েমেনের বিচারক করে পাঠাতে চাইলেন। আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমাকে পাঠাচ্ছেন, আমি একজন কম বয়সী মানুষ, বিচার-আচার সম্পর্কে আমার পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। হুজুর সা: বললেন, আল্লাহ তোমার অন্তরকে পথ দেখাবেন এবং তোমার জবানকে অবিচলিত রাখবেন। শোনো! যখন বিবদমান দু’জন লোক তোমার কাছে বিচার নিয়ে আসবে, তখন তুমি প্রথম ব্যক্তির কথা শুনেই তোমার রায় দিয়ে দেবে না, বরং উভয়ের কথা শুনে এরপর তা যাচাই-বাছাই করে ফায়সালা দেবে। হজরত আলী রা: বললেন, এরপর আমি কোনো ফায়সালা দিতে সন্দিহান হইনি (তিরমিজি, আবু দাউদ, ইবনে মাজা)।

ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে বিচারকাজ পরিচালনা না করা সম্পর্কে নবী করিম সা: কঠোর বাণী উচ্চারণ করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু আউফা রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা একজন বিচারকের সাথে ততক্ষণ থাকেন, যতক্ষণ তিনি বিচারকাজে জুলুম-অত্যাচারের ঊর্ধ্বে থাকেন, যখন তিনি জুলুম ও বেইনসাফি করেন তখনই আল্লাহ তার থেকে পৃথক হয়ে যান এবং শয়তান এসে তার সাথী হয়ে যায়’ (তিরমিজি, ইবনে মাজা)। হজরত আয়েশা রা: রাসূলুল্লাহ সা: হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ন্যায়বিচারক কাজী কিয়ামতের দিন এই আকাক্সক্ষা করবেন যে, দুই ব্যক্তির মধ্যে সামান্য খেজুরের ফায়সালাও যদি তাকে পৃথিবীতে না করতে হতো, তবে কতই না ভালো হতো (মুসনাদে আহমদ)।

উপসংহার : এ ধরনের ইনসাফ রাসূলুল্লাহ সা:-এর অনুপম বিচারনীতির নিদর্শন। তিনিই পৃথিবীতে রাসূল হিসেবে আল্লাহর তরফ থেকে শ্রেষ্ঠ মনোনীত বিচারক ছিলেন এবং তাঁর প্রতিটি বিচারকাজ আমাদের জন্য অনুসরণীয়-অনুকরণীয় সর্বোত্তম আদর্শ।

মাওলানা মুফাজ্জল হুসাইন খান
লেখক : ইসলামিক চিন্তাবিদ

হালাল-হারাম প্রসঙ্গ : যা অবৈধ নয় তাই বৈধ

 

‘তুমি কি লক্ষ্য করনি, নভোমণ্ডলে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সবই আল্লাহ্তা’আলা মানুষের কল্যাণের জন্য নিয়োজিত করে রেখেছেন এবং তোমাদের প্রতি বাহ্যিক ও গোপনীয়- দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান নিয়ামতসমূহ উদারভাবে ঢেলে দিয়েছেন?’ (সূরা লোকমান : ২০)
এসব ঘোষণা থেকে সুস্পষ্ট ও অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়, আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীস্থ সব কিছুই আল্লাহ্তা’আলা মানুষের জন্য মানুষের কল্যাণের ও রোগ-ব্যবহারের জন্যই সৃষ্টি করেছেন, কর্মে নিবদ্ধ করে রেখেছেন। এ কথা বলে আল্লাহ মানুষের প্রতি তাঁর অপরিসীম অনুগ্রহের কথাই জানিয়ে দিয়েছেন। তাহলে বিশ্বলোকের সব কিছুই মানুষের জন্য অবশ্যই হালাল হবে। তার কোনো একটির ভোগ-ব্যবহার মানুষের নিষিদ্ধ হতে পারে না, সব কিছুর পক্ষেই আল্লাহ ্অনুমতি নিরাজিত। এ সবই তো আল্লাহর দেয়া নিয়ামত। তা যদি নিষিদ্ধই হবে, তাহলে তা সব মানুষের জন্য সৃষ্টি করার কথা বলার কী তাৎপর্য থাকতে পারে?

তবে আল্লাহ নিজেই যদি সৃষ্ট সব কিছুর মধ্য থেকে কিছু কিছু জিনিস হারাম করে দিয়ে থাকেন, তাহলে সে কথা স্বতন্ত্র। এরূপ কোনো কোনো জিনিস বিশেষ কারণে ও বিশেষ কল্যাণ-উদ্দেশ্যে হারাম করে দিয়ে থাকলে তা অবশ্যই মানতে হবে। তা সাধারণভাবে হালাল কর দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম মাত্র এবং সে ব্যতিক্রমের মূলে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে বলে মনে করতে হবে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ইসলামি শরিয়াতে হারামের পরিধি খুব বেশি সঙ্কীর্ণ। হালালের ক্ষেত্র বিপুলভাবে বিস্তীর্ণ ও প্রশস্ত। কেননা সুস্পষ্ট অকাট্য ভাষায় হারাম ঘোষণাকারী আয়াত খুবই অল্প এবং তা কয়েকটি মাত্র। ইতিবাচকভাবে যেসব বিষয়ে নতুন করে কিছু বলা হয়নি- না হালাল, না হারাম, তা তো সে মৌলনীতির ভিত্তিতেই বিবেচিত হবে। আল্লাহ্র ক্ষমার সীমার মধ্যে গণ্য হবে।
এই পর্যায়ে রাসূলে কারিম সা:-এর ঘোষণাও উল্লেখ্য। তিনি ইরশাদ করেছেন :

‘আল্লাহ তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল, যা হারাম করেছেন তা হারাম। আর যে বিষয়ে তিনি নীরবতা অবলম্বন করেছেন, তাতে ক্ষমা রয়েছে। অতএব, তোমরা আল্লাহ্র কাছ থেকে তাঁর ক্ষমা গ্রহণ কর। কেননা আল্লাহ্ তো কোনো কিছু ভুলে যান না (ভুলবশত বলেননি এমন তো হতে পারে না)। এ কথার প্রমাণ হিসেবে তিনি পাঠ করলেন : ‘তোমাদের প্রভু ভুলে যান না’। (কুরআনের একটি আয়াতের অংশ)।
নবী কারিম সা: বলেছেন :
‘আল্লাহতা’আলা কতগুলো কাজকে ফরজ করে দিয়েছেন। অতএব তোমরা তা নষ্ট করে ফেল না। তিনি কতগুলো সীমা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, তোমরা সে সীমা লঙ্ঘন করো না। কিছু কিছু জিনিসকে তিনি হারাম করেছেন, তোমরা তার বিরোধিতা করো না। আর তোমাদের প্রতি অনুগ্রহবশত না ভুলে গিয়ে অনেক বিষয়ে তিনি পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করেছেন। অতএব, সে বিষয়ে তোমরা বিতর্কে লিপ্ত হয়ো না।’ (তিরমিযি, ইবনে মাযাহ)

এ পর্যায়ে আমি একটি বিষয়ে সতর্কবাণী উচ্চারণ করতে চাই। ‘মৌলিকভাবে সব কিছুই মুবাহ্’ কথাটি কতগুলো দ্রব্যসামগ্রীর ব্যাপারেই প্রযোজ্য নয়। যাবতীয় কাজকর্ম, হস্তক্ষেপ, পদক্ষেপ গ্রহণ ইত্যাদিÑ যা ইবাদতের ব্যাপারসমূহে গণ্য নয় সে ক্ষেত্রেও এ মৌলনীতিটি প্রযোজ্য। এগুলো আমরা বলি আদত-অভ্যাস, পারস্পরিক কার্যাদি। এসবের মূল কথা হলো, আসলে তা সবই অ-হারাম- শর্তহীনভাবেই তা হালাল। তবে শরিয়াতদাতা যদি কোনো কাজকে হারাম ঘোষণা করে থাকেন এবং কোনো বিষয়ে কোনো শর্ত আরোপ করে থাকেন, তবে তা অবশ্যই হারাম হবে এবং সে শর্তকে অবশ্যই মানতে হবে। এ পর্যায়ে আল্লাহ্ ঘোষণা হচ্ছে :
‘তোমাদের প্রতি যা যা হারাম করা হয়েছে, তার সব কিছুই সুস্পষ্ট করে তিনি তোমাদের বলে দিয়েছেন।’

এ ঘোষণা দ্রব্যাদি ও কার্যাদি উভয় ব্যাপারেই প্রযোজ্য। কিন্তু ইবাদতের ব্যাপার এ থেকে স্বতন্ত্র ও ভিন্নতর। কেননা তা-ই হচ্ছে আসল দ্বীন। দ্বীনের মৌল ব্যাপার আর তা কেবলমাত্র ওহির সূত্রেই লাভ করা যেতে পারে। ওহির মাধ্যমে যা ইবাদত বলে জানা যায়নি, তা কখনই এবং কোনোক্রমেই ইবাদতের মধ্যে গণ্য হতে পারে না। এ সম্পর্কে রাসূলে কারিম সা:-এর ঘোষণা হচ্ছে :
‘আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে শামিল নয় এমন কোনো জিনিস যদি কেউ দ্বীনের মধ্যে নতুন করে উদ্ভাবন করে তবে তা অবশ্যই প্রত্যাখ্যাত হবে।’ (বুখারি, মুসলিম)

কেননা প্রকৃত দ্বীন দুটো কাজের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। একটি হচ্ছে এই যে, বন্দেগি করা হবে কেবলমাত্র এক আল্লাহ্- এক আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো বন্দেগি করা হবে না। এবং দ্বিতীয়টি এই যে, কেবলমাত্র আল্লাহ্ বন্দেগি করা হবে কেবলমাত্র আল্লাহ্ দেয়া বিধান অনুযায়ী, অন্য কোনোভাবে নয়। কাজেই কেউ যদি নিজের পক্ষ থেকে ইবাদতের কোনো পন্থা বা অনুষ্ঠান উদ্ভাবন করে- সে যে-ই হোক না কেন তা গুমরাহী ছাড়া আর কিছুই নয়।

তবে সাধারণ অভ্যাস-আদত কিংবা পারস্পরিক লেনদেন সম্পর্ক বিনিময় প্রভৃতি পন্থা ও পদ্ধতির উদ্ভাবক মানুষ নিজে, শরিয়তদাতা নন। শরিয়াতদাতা এ পর্যায়ে শুধু বলে দেবেন কোন্পন্থা- পদ্ধতি বা নিয়ম ঠিক- যথার্থ এবং কোন্টি যথার্থ নয়। যে ধরনের কাজ বিপর্যয় ও ক্ষতিমুক্ত সেগুলোকে তিনি বহাল রাখারই পক্ষপাতী।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন : বান্দাদের কথাবার্তা ও কাজকর্মসংক্রান্ত তৎপরতা দুই ধরনের। কতগুলো আছে ইবাদত, যদ্দারা লোকদের দ্বীনী অবস্থার সংশোধন সাধিত হয়। আর কতগুলো আছে আদত-অভ্যাস, দুনিয়ায় বসবাস করার জন্য তা মানুষের জীবনে জরুরি। এ পর্যায়ে শরিয়তের দৃষ্টিকোণ হলো আল্লাহ যেসব ইবাদত ফরজ করে দিয়েছেন কিংবা যা তিনি পছন্দ করেন, তা শরিয়তের বিধান ব্যতীত অন্য কোনোভাবে প্রমাণিত হতে পারে না।

মানুষের সাধারণ আদত-অভ্যাসের ব্যাপারটি ভিন্নতর। আসলে তা সবই মুবাহ- দোষমুক্ত, অনির্দিষ্ট। তার মধ্য থেকে যে যেটিকে আল্লাহ হারাম ঘোষণা করেছেন, কেবল সে সেটিই হারাম হবে, অন্য কিছু নয়। এ কথাকে সত্য না মানলে আমাদের প্রতি এ আয়াতটি প্রযোজ্য হবে।
‘আল্লাহ্ তোমাদের জন্য যে রিজক নাযিল করেছেন, তন্মধ্য থেকে কিছু তোমরা হারাম বানিয়েছ আর কিছু হালাল?’ এটা কি রকম কাজ তা কি তোমরা ভেবে দেখেছ?’ (সূরা ইউনুস : ৫৯)

এ হচ্ছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক কল্যাণবহ মৌলনীতি বিশেষ। এ মৌলনীতির ভিত্তিতে আমরা বলব, ক্রয়-বিক্রয়, হেবা, ইজারা ইত্যাদি মানুষের সামাজিক জীবনের আদত-অভ্যাস বা প্রচলনের ব্যাপার। এ দুনিয়ায় জীবন যাপনের জন্য এগুলো মানুষকে মেনে চলতে হয়- যেমন পানাহার ও পোশাক পরিধান মানুষের অপরিহার্য হয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে শরিয়ত উত্তম ও সুষ্ঠু নিয়মাদি শিক্ষা দিয়েছে। তাই যে যে ক্ষেত্রে কোনোরূপ বিপর্যয় পরিলক্ষিত হয়েছে শরিয়ত তা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে এবং যা একান্তই জরুরি তা অপরিহার্য কর্তব্য বলে ঘোষণা করেছে। অতঃপর যা যা অবাঞ্ছনীয় দেখা গেছে, সে সবকে ‘মাকরূহ’ বলেছে আর যে যে কাজে সার্বিক কল্যাণ লক্ষ্য করা গেছে, সেগুলোকে বলেছেন মুস্তাহাব। ফলে এক্ষেত্রের কাজগুলোকে আমূল উৎপাটিত করার বা নতুন করে ঢালাই করার প্রয়োজন হয়নি।

এ সত্য প্রতিভাত হওয়ার পর বলা যায়, লোকেরা নিজেদের ইচ্ছেমতো লেনদেন, ব্যবসায় বাণিজ্য ও মজুরি বিনিময়ে কাজ করার জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন, যতক্ষণ না শরিয়ত তার কোনো কাজকের হারাম বলে ঘোষণা করছে। লোকদের পানাহারের ব্যাপারটির দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে যা যা হারাম, তা পরিহার করে চললেই হলো। এ ছাড়া এ ক্ষেত্রে আর কোনো বিধিনিষেধের নিয়ন্ত্রণ মেনে চলতে বাধ্য করা হয়নি। ফলে তা সবেই মৌলিকভাবে মুবাহ-অনিষিদ্ধ।
এ মৌলনীতির ভিত্তিতে ইবনে তাইমিয়ার ছাত্র ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম এবং হাম্বলি মাযহাবের সব ফিকাহবিদই বলেছেন :
‘চুক্তি ও শর্তাদি মূলত সবই মুবাহ। যে চুক্তি সম্পর্কে শরিয়ত কোনো আপত্তি করেনি এবং যা হারাম ঘোষিত হয়নি, তা সবই হালাল।’

সহিহ্ হাদিস থেকেও এ মৌলনীতির সমর্থন পাওয়া যায়। হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ্ বলেছেন :
‘আমরা আযল করছিলাম, তখন কুরআন নাযিল হচ্ছিল। নিষেধ করার মতো কিছু থাকলে কুরআন তা অবশ্যই নিষেধ করে দিত।১
এ থেকে শুধু এতটুকুই প্রমাণ করতে চাচ্ছি যে, যে বিষয়ে ওহিসূত্রে কোনো নিষেধ আসেনি তা অনিষিদ্ধ, তা হারাম নয়। নিষেধকারী কোনো ঘোষণা নাযিল না হওয়া পর্যন্ত তা সম্পূর্ণ জায়েয। শরিয়ত সম্পর্কে এ ছিল সাহাবিদের বিশ্বাস এবং তাঁরা যে শরিয়তের মূলতত্ত্ব যথার্থ বুঝতে পেরেছিলেন, তা এ কথা থেকেই অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়।

মোটকথা এসব দৃষ্টান্ত ও দলিল থেকে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, সে ইবাদত ও সে নিয়মের ইবাদতই শরিয়তসম্মত, যা স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন। আর মানুষের আদত-অভ্যাসের মধ্য থেকে হারাম শুধু তা-ই যা স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা হারাম ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ্যা হারাম করেননি, তা কখনই হারাম হতে পারে না।

আল্লামা ইউসুফ আল-কারযাভী

অনুবাদ : মোহাম্মদ আবদুর রহিম

আপনার মন্তব্য দিন

শেয়ার