ফরমালিন কী এবং দেহে ফরমালিনের ভয়ঙ্কর প্রভাব ও প্রতিকারের উপায়ঃ

ফরমালিন কী এবং এর প্রকৃত ব্যবহার।
মানব দেহে ফরমালিনের ভয়ঙ্কর প্রভাব ও প্রতিকারের উপায়ঃ
====================================
ফর্মালিন (-CHO-)n হল ফর্মালডিহাইডের (CH2O) পলিমার। ফরমালডিহাইডের (রাসায়নিক সংকেত HCHO) ৩৭ থেকে ৪০ শতাংশ জলীয় দ্রবণই হলো ফরমালিন। ফরমালিনে ফরমালডিহাইড ছাড়াও ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মিথানল মিশ্রত থাকে।

ফরমালিন এন্টি-ব্যাকটেরিয়াল বা সংক্রামক ব্যাধি নাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।ফর্মালডিহাইড দেখতে সাদা পাউডারের মত। জলে সহজেই দ্রবনীয়। শতকরা ৩০-৪০ ভাগ ফর্মালিনের জলীয় দ্রবনকে ফর্মালিন হিসাবে ধরা হয়। ফর্মালিন সাধারনত টেক্সটাইল, প্লাষ্টিক, পেপার, রং, কনস্ট্রাকশন ও মৃতদেহ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়।

ফরমালিনে ফরমালডিহাইড ছাড়াও মিথানল থাকে, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। লিভার বা যকৃতে মিথানল এনজাইমের উপস্থিতিতে প্রথমে ফরমালডিহাইড এবং পরে ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয়। দুটোই শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।সাধারণত ফরমালিন মানুষের লাশসহ মৃত প্রাণীর দেহর পচন রোধ করতে ব্যবহার করা হয়।ফরমালডিহাইড ও মিথানল উভয়ই বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ এবং মানব দেহের জন্য ক্ষতির কারন।

ফরমালিনের অপব্যবহারও প্রভাবঃ ফরমালিন সহজ লভ্য এবং দামে পাওয়া যায়, তাই অসৎ আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা সরাসরি ফরমালিন এবং ফরমালিন মিশ্রিত বরফ দিয়ে মাছ সংরক্ষণ এবং বিক্রি করছে।

বাজারে যেসব বিদেশী ফল ও দেশী মৌসুমী ফলমূলই পাওয়া যায় প্রায় সবগুলোতে ফরমালিন মেশানো হয়। ফরমালিন মিশ্রিত পানি ফলের উপর ছিটিয়ে দেওয়ার কিছুক্ষণ পর শুকিয়ে যায় যার ফলে আমরা বুঝতে পারছি না যে ফলগুলোতে ফরমালিন আছে কিনা? দেখা গেছে যে এক মাসেরও বেশি সময় পরে ফলটি টাটকা দেখা যায়।

শরীরে ফরমালিনের ভয়ঙ্কর প্রভাবঃ
======================
ফরমালিন শরীরে প্রবেশ করলে তার প্রভাব মারাত্মক ক্ষতিকর। ফরমালিন শরীরে প্রবেশের পর লিভার বা যকৃতে মিথানল এনজাইমের উপস্থিতিতে প্রথমে ফরমালডিহাইড এবং পরে ফরমিক অ্যাসিডে পরিণত হয়। দুটি অ্যাসিডের যৌগই শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

আমাদের রক্ত বা টিস্যুতে মাত্রাতিরিক্ত ফরমিক অ্যাসিড জমা হলে মেটাবলিক এসিডোসিস উৎপন্ন হয়। এসিডোসিস শরীরের অ্যাসিড বেস এবং আয়নিক ভারসাম্য নষ্ট করে সেল বা কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা প্রদান করে। তাৎক্ষনিকভাবে পেটের পীড়া, বদহজম, ডায়রিয়া, আলসার চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ হয়ে থাকে। এমনকি লিভার ক্যান্সারও সৃষ্টি করতে পারে।

ফরমালিন যুক্ত ফলমূলসহ অন্যান্য খাবার গ্রহণের ফলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা নষ্ট, হাঁচি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, আ্যাজমা রোগের উপদ্রব হয়। ফুসফুস, শ্বাসনালীতে ক্যান্সার হতে পারে। বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম, মাথাব্যথা ও চোখ জ্বালাপোড়া করতে পারে এবং ফরমালিনযুক্ত মাছ পাকস্থলী, ফুসফস ও শ্বাসনালীতে ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।

ফরমালিনযুক্ত খাবারের কারনে পাকস্থলি, অস্থিমজ্জা আক্রান্ত হওয়ার ফলে রক্তশূন্যতাস ও অন্যান্য রক্তের রোগ এমনকি ব্লাড ক্যান্সার হতে পারে। এতে মৃত্যুবিহীন অন্য কোন পথ নাই। ফরমালডিহাইড চোখের রেটিনায় এডিমা সৃষ্টির মাধ্যমে রেটিনার কোষ ধ্বংস করে। ফলে মানুষ অন্ধ হয়ে যেতে পারে।

এছাড়া গর্ভবর্তী মায়েদের ক্ষেত্রেও মারাত্মক ঝুকি রয়েছে। সন্তান জন্মদেওয়ার ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে প্রসব জটিলতা, বাচ্চার জন্মগত দোষত্রুটি, হাবা-গোবাসহ প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।

ফরমালিনযুক্ত খাবারে সকলেই ঝুঁকিতে থাকে তবে বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধ ব্যক্তিরা অধিক ঝুঁকিতে থাকে। ফরমালিনযুক্ত দুধ, মাছ, ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়ার ফলে শিশুদের শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে আশংকাজনকভাবে। দেখা দিচ্ছে বিভিন্ন অঙ্গ- পতঙ্গ নষ্ট, বিকলাঙ্গতা ও ক্যান্সারসহ নানা সব মরনব্যাধি। ভেজাল খাবার কিংবা বিষাক্ত কেমিক্যাল আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

ফরমালিনের মারাত্মক ক্ষতিকর দিক:
======================
১।ফরমালডিহাইড চোখের রেটিনাকে আক্রান্ত করে রেটিনার কোষ ধ্বংস করে। ফলে মানুষ অন্ধ হয়ে যেতে পারে।

২।তাৎক্ষণিকভাবে ফরমালিন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, কারবাইডসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহারের কারণে পেটের পীড়া, হাঁচি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বদহজম, ডায়রিয়া, আলসার, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ হয়ে থাকে।

৩।ধীরে ধীরে এসব রাসায়নিক পদার্থ লিভার, কিডনি, হার্ট, ব্রেন সব কিছুকে ধ্বংস করে দেয়। লিভার ও কিডনি অকেজো হয়ে যায়। হার্টকে দুর্বল করে দেয়। স্মৃতিশক্তি কমে যায়।

৪।ফরমালিনযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করার ফলে পাকস্থলী, ফুসফুস ও শ্বাসনালিতে ক্যান্সার হতে পারে। অস্থিমজ্জা আক্রান্ত হওয়ার ফলে রক্তশূন্যতাসহ অন্যান্য রক্তের রোগ, এমনকি ব্লাড ক্যান্সারও হতে পারে। এতে মৃত্যু অনিবার্য।

৫।মানবদেহে ফরমালিন ফরমালডিহাইড ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয়ে রক্তের এসিডিটি বাড়ায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করে।

৬।ফরমালিন ও অন্যান্য কেমিক্যাল সামগ্রী সব বয়সী মানুষের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে। ফরমালিনযুক্ত দুধ, মাছ, ফলমূল এবং বিষাক্ত খাবার খেয়ে দিন দিন শিশুদের শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে। কিডনি, লিভার ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট, বিকলাঙ্গতা, এমনকি মরণব্যাধি ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা।

শিশুদের বুদ্ধিমত্তা দিন দিন কমছে।গর্ভবতী মেয়েদের ক্ষেত্রেও মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। সন্তান প্রসবের সময় জটিলতা, বাচ্চার জন্মগত দোষত্রুটি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে, প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম হতে পারে।

৭।এ ধরনের খাদ্য খেয়ে অনেকে আগের তুলনায় এখন কিডনি, লিভারের সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগের সমস্যায় ভুগছেন। দেখা যাচ্ছে, কয়েক দিন পরপর একই রোগী ডায়রিয়ায় ভুগছেন, পেটের পীড়া ভালো হচ্ছে না, চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনের সনাক্তকরন:
=====================
1) ফরমালডিহাইডের দ্রবণের সঙ্গে ২ সিসি ফিনাইল হাইড্রোজাইন হাইড্রোকোরাইড (১%) এবং ১ সিসি ৫% পটাসিয়াম ফেরিসায়ানাড দিয়ে তারপর ৫ সিসি ঘনীভূত হাইড্রোকোরিক অ্যাসিড মেশালে পুরো দ্রবণ গাঢ় গোলাপী রঙ হয়ে থাকে। একে বলা হয় সেরিভারস্ টেস্ট।

2) ফরমালডিহাইডের হালকা দ্রবণ যেমন মাছে ফরমালিন দেয়া আছে তা ধুয়ে তার জলে ১ সিসি সোডিয়াম নাইট্রোপ্রোসাইড মেশালে গাঢ় সবুজ নীল রঙ ধারণ করে। এতে ফরমালডিহাইড তথা ফরমালিনের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। এ সমস্ত কেমিক্যাল এবং রি-এজেন্ট পাওয়া খুব কঠিন এবং দামও অনেক বেশী। তাই সহজ এবং সাধারণ একটি পদ্ধতি বের করা যায়। যেমন সন্দেহযুক্ত ফরমালিন মাছ ধুয়ে জলে ৩% (ভলিউম) হাইড্রোজেন পারক্সাইড মেশালে ফরমালডিহাইড অক্সিডাইজড হয়ে ফরমিক অ্যাসিডে রূপান্তর হয়।

ফরমিক এসিড প্রমাণের জন্য সে জলে অল্প মারকিউরিক কোরাইড মেশালে সাদা রঙের তলানি পড়বে। তাতেই প্রমাণ হবে ফরমিক অ্যাসিড তথা ফরমালডিহাইড তথা ফরমালিন। এখন কথা হচ্ছে খাদ্যদ্রব্যে ফরমালনিরে উপস্তিতি পরীক্ষার উপকরণগুলো সহজলভ্য নয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, কেনার সময় যদি সাথে করে এসব নিয়ে যেতে হয় তাহলে হয়তো কেনাটাই ছেড়ে দিতে হবে।

কিভাবে মাছ থেকে ফর্মালিনের দূর করবেন?
==========================
1) ফরমালিনবিহীন মাছের ফুলকা উজ্জ্বল লাল র্বণ , চোখ ও আঁশ উজ্জ্বল হয়,শরীরে আঁশটে গন্ধ পাওয়া যায়,মাছের দেহ নরম হয়।

অন্যদিকে ফরমালিনযুক্ত মাছের ফুলকা ধূসর, চোখ ঘোলাটে ও ফরমালনিরে গন্ধ পাওয়া যায় হয়, আঁশ তুলনামূলক ধূসর র্বণরে হয়, শরীরে আঁশটে গন্ধ কম পাওয়া যায়, দেহ তুলনামূলক শক্ত হয়।

2) পরীক্ষায় দেখা গেছে জলে প্রায় ১ ঘন্টা মাছ’ ভিজিয়ে রাখলে ফর্মালিনের মাত্রা শতকরা ৬১ ভাগ কমে যায়।

3) লবনাক্ত জলে ফর্মালিন দেওয়া মাছ ১ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখলে শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ ফর্মালিনের মাত্রা কমে যায়।

4) প্রথমে চাল ধোয়া জলে ও পরে সাধারন জলে ফর্মালিন যুক্ত মাছ ধুলে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ ফর্মালিন দূর হয়।

5) সবচাইতে ভাল পদ্ধতি হল ভিনেগার ও জলের মিশ্রনে (জলে ১০ % আয়তন অনুযায়ী) ১৫ মিনিট মাছ ভিজিয়ে রাখলে শতকরা প্রায় ১০০ ভাগ ফর্মালিনই দূর হয়।

কিভাবে ফল ও সবজি থেকে ফর্মালিনের দূর করবেন?
================================
1) যে ধরনের রাসায়নিক দেয়া হোক না কেন যদি আমরা একটু সচেতন হই তাহলে ফল খাওয়া সম্ভব ।আমাদের যা করতে হবে তা হল- খাওয়ার আগে এক ঘণ্টা বা তার চেয়ে একটু বেশী সময় ফলগুলো জলে ডুবিয়ে রাখতে হবে।

2) লিচু কাঁচা অবস্থায় সবুজ। পাকার পর হয় ইটা লাল। এখন গাছে রাসায়নিক স্প্রে করে যার ফলে লিচু গাঁড় মেজেন্ডা রং ধারন করে তা বড়ই মনমুগ্ধকর। কিন্তু চকচক করলে সোনা হয় না সেটা মনে রেখে কখনোই গাঁড় মেজেনটা রঙ্গের লিচু কেনা যাবে না।
3) সবজি রান্না করার আগে গরম জলে লবণ মিশিয়ে ১০ মিনিট ডুবিয়ে রাখুন।

4) বেগুনে এক ধরনের রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহার করা হয় । এই রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহার ক্ষতিকর না যদি নিয়মানুসারে দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশের কৃষকেরা এ ব্যাপারে অজ্ঞ। তারা এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না। প্রতিটি কীটনাশকের ক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত থাকে। যেমন- একটি কীটনাশকের সেলফ লাইফ বা জীবন সীমা ৭দিন, তার মানে কীটনাশকটা ব্যবহারের ৭দিন পর্যন্ত সক্রিয় থাকবে, যা কীটপতঙ্গের জন্য ক্ষতিকর। তাই কৃষকদের উচিত কীটনাশক ব্যবহারের অন্তত ৭দিন পর ফলন তোলা। কিন্তু তারা তা না করে ২-১ দিনের মাঝেই ফলন তোলেন। ফলে কীটনাশকের ক্রিয়া ক্ষমতা থেকে যায়, যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে আমাদের উপর। তাই বাজারে সতেজ, উজ্জ্বল বেগুন না কিনে কিছুটা অনুজ্জ্বল, পোকায় কিছুটা আক্রান্ত এমন বেগুন কেনাই ভালো।

সৌজন্যেঃ কলামিস্ট আয়শা সিদ্দিকা অপু

আপনার মন্তব্য দিন

শেয়ার