টিউশুনির টাকায় লেখাপড়া করে আল্লাহর ইচ্ছায় পুলিশ সার্জেন্ট বেতাগীর শিমুল।

আল্লাহর কাছে ষাটর্ধো পঙ্গু মায়ের ফরিয়াদ, নিজের যোগ্যতা এবং এলাকাবাসীর দোয়ায় কোন প্রকার আর্থিক লেনদেন ছাড়াই পুলিশ সাজেন্ট হয়েছেন বরগুনার বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নের মেহেরগাজী করুনা গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান তরিকুল ইসলাম শিমুল। নুন আনতে পান্তা ফুরায় এমন পরিবারে জন্ম নিলেও লেখা পড়ায় ছিল প্রচন্ড আগ্রহ। টিউশুনির টাকায় লেখাপড়া করে আজ তার কাঙ্কিত লক্ষ অর্জনে সক্ষম হয়েছেন।

এ লক্ষ অর্জনে তাকে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে। এর আগেও ২০১৬ সালে পুলিশের এসআই পদে মৌখিক পরীক্ষা দিলেও কেন যেন তার চাকুরী হয়নি, কিন্তু তাঁর ভিতরে যে ইচ্ছাশক্তি ছিলো সেটিকে পুঁজি করে আবার শুরু করে নব উদ্যোমে পরবর্তী পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি। এবার আর বিফল হয়নি। সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এখন সে পুলিশ সার্জেন্ট। এছাড়াও তরিকুল ইসলাম শিমুল চলতি পুলিশের উপ পরিদর্শক (এসআই) নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ৩ ডিসেম্বর মৌখিক পরীক্ষার কার্ড পেয়েছেন। তবে এবারও সফলতার পথ মসৃণ ছিল না। বিপত্তি ঘটে পুলিশ সার্জেন্টের লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ নিয়ে। ১৫ জুন লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হলে ভুলে তার রোল নম্বরটি বাদ পরে যায়। এ ফলাফলে ২০২৫ জনকে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণের কথা বলা হলেও গণনা করে দেখা যায় রোল নম্বর আছে দুই হাজার ২৪টি। এ অবস্থায় পুলিশ সদর দপ্তর ৪৮ ঘন্টার মধ্যে শিমুলের রোল নম্বর অন্তর্ভূক্ত করে আপডেট ফলাফল প্রকাশ করে। এই আপডেট ফলাফল নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ (মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করা) একাধিক চাকরি প্রার্থীরা অভিযোগ করেন শিমুলকে টাকার বিনিময়ে লিখিত পরীক্ষায় পাস করানো হয়েছে। এই অভিযোগের সত্যতা প্রমানে বুধবার (১৮ অক্টোবর) সকালে সরেজমিনে শিমুলের বাড়িতে যাই। সাংবাদিক দেখে শিমুলের মা নাছিমা বেগম হাউ মাউ করে কেদে দেয় এবং আমাদের কাছে প্রশ্ন করেন, “এ্যাতে মোর গেদুর কি কোন ক্ষ্যাতি অইবে? আমরা ক্ষতি না হওযার আশ্বস্ত করলে তিনি বলেন, নুন ভাত খেয়ে থাকি শুধু মোর গেদুর (ছেলে) একটা চাকরীর জন্য। গেদুর জন্য দেড় লক্ষ বার দোয়া ইউনুস পরেছি। আমাগো অবস্থাতো দ্যাহেন। আমাগো কি টাকা দিয়ে চাকরী লয়োনের ক্ষ্যামতা আছে।” তার সাথে কথা বলার এক পর্যাযে মাগরিবের আযান দিলে নাছিমা বেগম পানি ও চাল ভাজা দিয়ে ইফতার করেন। রোজা রাখার কারন জানতে চাইলে তিনি বলেন, মোর গেদুর (ছেলে) যেন কোন বিপদ না অয় হেই জন্য রোজা মানত করছি।

জরাজীর্ণ ঘরের মধ্যে ১ফুট উচু মাচা বানিয়ে শিমুলের পঙ্গু মাকে সেখানে রাখা হয়েছে। তিনি হাটা চলা করতে পারেন না। ১৯৯৩ সালে রান্না করার সময় তার উপর রান্না ঘর ভেংগে পরে। এতে তার কোমর ভেংগে যায়। সেই থেকে তিনি পঙ্গু। টাকার অভাবে তার চিকিৎসা করানো যায়নি। চিকিৎসা করালে তিনি স্বাভাবিক ভাবে হাটা চলা করতে পারতেন বলে শিমুলের চাচাতো ভাই আব্দুর র্জ্জাাক মাতুব্বর জানান। স্ত্রী পঙ্গু হওয়ার পর স্বামী আব্দুর রব মাতুব্বর দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা থাকেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি মেজ। বড় ভাই জসিম উদ্দিন শামীম ও ছোট ভাই মো. আলম এসএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। শামীম গাজীপুরে একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী এবং আলম মিরপুরের একটি গার্মেন্টসে কাজ করেন। শিমুল ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজ থেকে হিসাব বিজ্ঞানে ২০১২ সালে অনার্স এবং ২০১৩ সালে মাস্টার্স পাস করেন। প্রভাব খাটিয়ে শিমুলের পিতা আব্দুর রব মাতুব্বর স্থানীয় আওয়ামীলীগের কর্মী এবং শিমুল ছাত্রলীগের সমর্থক বলে জানা য়ায়।
শিমুলের প্রতিবেশী হোসনাবাদ আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নান্না মিয়া বলেন, লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে চাকরী নেওয়ার সামর্থ ওর নাই। কেউ যদি এটা বলে তা সম্পূর্ন অবান্তর। শিমুল আসলেই একজন মেধাবী ছাত্র।

কাজিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সেলিম আহম্মেদ বলেন, শিমুল আমার স্কুলের একজন মেধাবী ছাত্র। অত্যন্ত গরীব পরিবারের সন্তান। আমরা বিভিন্ন সময়ে ওকে সাহায্য সহযোগিতা করেছি। শিক্ষকরা ওকে ফ্রি প্রাইভেট পড়িয়েছে।
হোসনাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেযারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মাকসুদুর রহমান ফোরকান বলেন, শিমুলের ১০ টাকা দিয়ে চাকুরী নেওয়ার ক্ষমতা নেই। টাকা দিয়ে ওর চাকরি নেওয়া প্রশ্নই আসে না। তিনি আরও বলেন, ওর পরিবার আওয়ামীলীগ মনা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী। প্রভাব খাটানোর মতো কোনো স্বজনও শিমুলের নেই। এবার নিছক ভাগ্যের জোরেই তার চাকরি হয়েছে বলে এলাবাসী জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিমুলকে ভাগ্যবান উল্লেখ করে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (রিক্রুটমেন্ট অ্যান্ড ক্যারিয়ার প্লানিং) মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, লিখিত পরীক্ষার ফলাফলে দুই হাজার ২৫টি রোল নম্বরের কথা বলা হলেও গণনার পর দেখা যায় রোল নম্বর আছে দুই হাজার ২৪টি। যে নম্বরটি বাদ পড়েছিল সেটি খুঁজে বের করে সেই রোলটি অন্তর্ভূক্ত করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আপডেট ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

হবু পুলিশ সার্জেন্ট তরিকুল ইসলাম শিমুল এর রয়েছে জীবনে টিকে থাকার গল্প। হেরে না যাওয়া এই মেধাবী মানুষটি সেই অনুভূতির কথা জানিয়ে বলেন ‘লিখিত পরীক্ষার ফলাফল দেখে হতাশ হয়েছিলাম। কারণ, ভালো পরীক্ষা দেয়ার পরও আমার রোল নম্বর ছিল না। কোনো উপায় না পেয়ে কেবল আল্লাহকে ডেকেছি। আমি এবং আমার মা এক লাখ ৫০ হাজার বার সুরায়ে ইউনুস পড়েছি। ফলাফল প্রকাশের ২/৩ দিন পর শবেবরাতের দিন বিকাল ৪টার দিকে পুলিশ সদর দফতর থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান স্যার আমাকে ফোন দেয়। ফোনে আমার নাম জানতে চ্য়া। আমি তাকে আমার নাম জানালে তিনি লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওযার কথা জানিয়ে আমাকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকেন। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ার কথা তাকে জানালে তিনি বলেন, ফলাফল আপডেট করা হয়েছে। সেখানে আপনার নাম আছে। আপনি আপডেট ফলাফল দেখুন। এরপর পুলিশ সদর দফতরে গিয়ে আপডেট ফলাফল দেখে ১৩ আগস্ট মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেই। তরিকুল ইসলাম শিমুল আরও বলেন, ‘আমি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। টিউশুনি করে আমার লেখা পড়ার খরচ চালিয়েছি। এখনো আমি টিউিশনির টাকায় ঢাকায় নিজে চলি এবং মা-কেও টাকা পাঠাই। পুলিশ সার্জেন্ট হওয়ার আগে কেমন ছিলো জীবন সংগ্রাম, সে কথা জানতে চাইলে কিছুক্ষন নীরব থেকে বলেন, একটা সময় মনে হচ্ছিলো জীবনে বেঁচে থাকার কোন অর্থ নেই! জীবনটা অর্থহীন মনে হচ্ছিলো! নীরবে কেঁেদছি কিন্তু সংগ্রাম করেছি মায়ের কথা ভেবে। আজ আমি সফল, এ সবই হয়েছে আমার মায়ের দোয়া এবং আল্লাহর অশেষ রহমতে।
(আপনাদেরো বলি নিরাশ হবেন না, আল্লাহ্‌ উপর ভরসা রাখুন, নিজের চেষ্টা চালিয়ে যান, আমাদের পেইজের ফ্যান আমাদের জন্য মুল্যবাদ, তাই আপনাদের পাশে থেকে জীবিনের সকল কাজে সফল হন সেই চেষ্টা করে যাবো।) ইন শা আল্লাহ্‌
___নিউজ ক্রেডিট ____ এল এন সামিম শিকদার।

আপনার মন্তব্য দিন

শেয়ার