জাপানে পড়তে যাওয়া এক ছাত্রী একদিন ফোনে বললো

জাপানীদের থেকে শিক্ষণীয়
জাপানে পড়তে যাওয়া এক ছাত্রী একদিন ফোনে বললো- দিদি , বড়ই লজ্জায় আছি।
কেন কি হয়েছে ?
ড্রইং ক্লাসে ড্রইং বক্স নিয়ে যাইনি।
তো?

জাপানী স্যার বড় একটা শিক্ষা দিয়েছেন।
কি করেছেন ?
আমার কাছে এসে ক্ষমা চেয়েছেন। বলেছেন আজ যে ড্রইং বক্স নিয়ে আসতে হবে তা স্মরণ রাখার মত জোর দিয়ে আমাকে বুঝিয়ে বলতে পারেন নি। তাই তিনি দুঃখিত।
হুম।

আমি তো আর কোন দিন ড্রইং বক্স নিতে ভুলবো না, দিদি । আজ যদি তিনি আমাকে বকা দিতেন বা অন্য কোন শাস্তি দিতেন আমি কোন একটা মিথ্যা অজুহাত দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করতাম।
জাপানী দল বিশ্বকাপে হেরে গেলেও জাপানী দর্শকরা গ্যালারী পরিষ্কার করে স্টেডিয়াম ত্যাগ করেন। এ কেমন কথা? এটা কি কোন পরাজয়ের ভাষা! হেরেছিস- রেফারীর গুষ্টি তুলে গালি দে- বলে দে পয়সা খেয়েছে। বিয়ারের ক্যান, কোকের ক্যান, চিনাবাদামের খোসা যা পাস ছুঁড়ে দে। দুই দিন হরতাল ডাক। অন্তত বুদ্ধিজীবিদের ভাষায় এটা তো বলতে পারিস যে খেলোয়াড় নির্বাচন ঠিক হয়নি- সরকারের অথবা বিরোধী দলের হাত আছে।


দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হেরে গিয়ে জাপানের সম্রাট হিরোহিতো আমেরিকার প্রতিনিধি ম্যাক আর্থারের কাছে গেলেন। প্রতীকি আইটেম হিসাবে নিয়ে গেলেন এক ব্যাগ চাল। হারাকিরি ভঙ্গিতে হাঁটু গেড়ে মাথা পেতে দিয়ে বললেন- আমার মাথা কেটে নেন আর এই চাল টুকু গ্রহণ করুন। আমার প্রজাদের রক্ষা করুন। ওরা ভাত পছন্দ করে। ওদের যেন ভাতের অভাব না হয়।

আরে ব্যাটা তুই যুদ্ধে হেরেছিস তোর আত্মীয় স্বজন নিয়ে পালিয়ে যা। তোর দেশের চারিদিকেই তো জল । নৌপথে কিভাবে পালাতে হয় আমাদের ইতিহাস (লক্ষণ সেন) থেকে শিখে নে। কোরিয়া বা তাইওয়ান যা। ওখানকার মীর জাফরদের সাথে হাত মেলা। সেখান থেকে হুংকার দে।
সম্রাট হিরোহিতোর এই ক্যারেক্টার আমেরিকানদের পছন্দ হলো। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কুখ্যাত মহানায়কদের মধ্যে কেবলমাত্র হিরোহিতোকে বিনা আঘাতে বাঁচিয়ে রাখা হলো।



২০১১ সালের ১১ই মার্চ। Tsunami র আগাম বার্তা শুনে এক ফিশারি কোম্পানীর মালিক সাতো সান প্রথমেই বাঁচাতে গেলেন তার কর্মচারীদের। হাতে সময় আছে মাত্র ৩০ মিনিট। প্রায়রিটি দিলেন বিদেশি (চাইনিজ) দের। একে একে সব কর্মচারীদের অফিস থেকে বের করে পাশের উঁচু টিলায় নিজ হাতে রেখে এলেন। সর্বশেষে গেলেন তার পরিবারের খোঁজ নিতে। ইতিমধ্যে Tsunami সাহেব এসে হাজির। সাতো সানকে চোখের সামনে কোলে তুলে ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন। আজও খোঁজ হীন হয়ে আছেন তার পরিবার। ইসস -সাতো সান যদি প্রমোটর মালিকের সাথে একটা বার দেখা করার সুযোগ পেতেন ।

সাতো সান অমর হলেন চায়না তে। চাইনিজরা দেশে ফিরে গিয়ে শহরের চৌরাস্তায় উনার প্রতিকৃতি বানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন।

নয় বছরের এক ছেলে। স্কুলে ক্লাস করছিল। Tsunami-র আগমনের কথা শুনে স্কুল কর্তৃপক্ষ সব ছাত্রদের তিন তলায় জড়ো করলো। তিন তলার ব্যালকনি থেকে দেখলো তার বাবা আসছে গাড়ি নিয়ে। গাড়িকে ধাওয়া করে আসছে ফোসফোসে জলের সৈন্য দল। গাড়ির স্পিড জলে র স্পিডের কাছে হার মেনে গেলো। চোখের সামনে নাই হয়ে গেল বাবা। সৈকতের নিকটেই ছিল তাদের বাড়ী । মা আর ছোট ভাই ভেসে গেছে আরো আগে। পরিবারের সবাইকে হারিয়ে ছেলেটি আশ্রয় শিবিরে উঠলো। শিবিরের সবাই ক্ষুধায় আর শীতে কাঁপছে। ভলান্টিয়াররা রুটি বিলি করছেন। আশ্রিতরা লাইনে দাড়িয়ে আছেন। ছেলেটিও আছে। এক বিদেশী সাংবাদিক দেখলেন, যদ্দুর খাদ্য (রুটি) আছে তাতে লাইনের সবার হবেনা । ছেলেটির কপালে জুটবে না। সাংবাদিক সাহেব তার কোট পকেটে রাখা নিজের ভাগের রুটি দুটো ছেলেটিকে দিলেন। ছেলেটি ধন্যবাদ জানিয়ে রুটি গ্রহন করলো। তারপর যেখান থেকে রুটি ডিস্ট্রিবিউশন হচ্ছিল সেখানেই ফেরত দিয়ে আবার লাইনে এসে দাঁড়াল।

সাংবাদিক সাহেব কৌতুহল ঢাকতে পারলেন না। ছেলেটিকে জিজ্ঞাস করলেন – এ কাজ কেন করলে খোকা? খোকা উত্তর দিল- বন্টন তো ওখান থেকে হচ্ছে। উনাদের হাতে থাকলে বন্টনে সমতা আসবে। তাছাড়া লাইনে আমার চেয়েও বেশী ক্ষুধার্ত লোক থাকতে পারে।
সহানুভুতিশীল হতে গিয়ে বন্টনে অসমতা এনেছেন- এই ভেবে সাংবাদিক সাহেবের পাপবোধ হলো। এই ছেলের কাছে কি বলে ক্ষমা চাইবেন ভাষা হারালেন।


যাদের জাপান সম্পর্কে ধারণা আছে তারা সবাই জানেন…যদি ট্রেনে বা বাসে কোন জিনিস হারিয়ে যায়, অনেকটা নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন, ঐ জিনিস আপনি অক্ষত অবস্থায় ফেরত পাবেন। গভীর রাতে কোন ট্রাফিক নেই, কিন্তু পথচারী ঠিকই ট্রাফিক বাতি সবুজ না হওয়া পর্যন্ত পথ পার হচ্ছেন না। ট্রেনে বাসে টিকিট ফাঁকি দেয়ার হার (%) প্রায় শুন্যের কোঠায়। একবার ভুলে ঘরের দরজা লক না করে এক ভারতীয় দেশে গেলেন মাস খানেক পর এসে দেখেন, যেমন ঘর রেখে গেছেন, ঠিক তেমনই আছে।
এই শিক্ষা জাপানীরা কোথায় পায়?

সামাজিক শিক্ষা শুরু হয় কিন্ডারগার্টেন লেভেল থেকে। সর্বপ্রথম যে তিনটি শব্দ এদের শিখানো হয় তা হলো-
কননিচিওয়া (হ্যালো) – পরিচিত মানুষকে দেখা মাত্র হ্যালো বলবে।
আরিগাতোউ (ধন্যবাদ) – সমাজে বাস করতে হলে একে অপরকে উপকার করবে। তুমি যদি বিন্দুমাত্র কারো দ্বারা উপকৃত হও তাহলে ধন্যবাদ দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।
গোমেননাসাই (দুঃখিত) – মানুষ মাত্রই ভুল করবে এবং সেই ভুলের জন্য ক্ষমা চাইবে।

এগুলো যে শুধু মুখস্ত করে শেখানো হয় তা না। বাস্তবে শিক্ষকরা প্রো-এক্টিভলি সুযোগ পেলেই ব্যবহার করবেন এবং করিয়ে ছাড়বেন।
সমাজে এই তিনটি শব্দের গুরুত্ব কত তা নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পারছেন। এই শিক্ষাটা এবং প্রাকটিস ওরা বাল্যকাল থেকে করতে শেখে। আমাদের রাজনীতিবিদরা বাল্যকালটা যদি কোন রকমে জাপানের কিন্ডারগার্টেনে কাটিয়ে আসতে পারতেন।

কিন্ডারগার্টেন থেকেই স্বনির্ভরতার ট্রেনিং দেয়া হয়। সমাজে মানুষ হিসাবে বসবাস করার জন্য যা দরকার – নিজের বই খাতা, খেলনা, বিছানা নিজে গোছানো; টয়লেট ব্যবহার, পরিষ্কার করা; নিজের খাবার নিজে খাওয়া, প্লেট গোছানো ইত্যাদি। প্রাইমারী স্কুল থেকে এরা নিজেরা দল বেধে স্কুলে যায়। দল ঠিক করে দেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। ট্রাফিক আইন, বাস ট্রেনে চড়ার নিয়ম কানুন সবই শিখানো হয়। আপনার গাড়ি আছে, বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে আসবেন, উল্টে আপনাকে লজ্জা পেয়ে আসতে হব।
#সংগৃহীত # ধন্যবাদ কিশোর ভাই।

ছোট শিশু উমায়েরের একটি ছোট পাখি ছিল। নবীজি সা: তার কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। বললেন, হে উমায়ের,

সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নির্যাতনের চিত্র ভয়াবহ রূপ লাভ করেছে। শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। শিশুদের ভালোবাসা ও তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য সম্পর্কে ইসলাম যে দিকনির্দেশনা দিয়েছে, তা মেনে চললে এ নৈতিক অবক্ষয় থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব হতো। হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘এক বেদুইন নবী সা:-এর কাছে এসে বলল, আপনারা শিশুদের চুমু দেন, আমরা তো তাদের চুমু দেই না। উত্তরে নবী সা: বলেন, আল্লাহ তায়ালা তোমার অন্তর থেকে দয়ামায়া উঠিয়ে নিয়ে গেলে আমি তার কী করতে পারি’ (বুখারি)।

কোনো একদিন নবী সা: ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য গৃহ থেকে বের হলেন। একটু গিয়ে দেখলেন, এক শিশু মলিন বেশে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। নবী সা: তার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাবা, তুমি কাঁদছে কেন? শিশুটি জবাবে বলল, আমার বাবা-মা বেঁচে নেই। আমি অসহায়, ঈদে আমার কোনো পোশাক নেই, আমি দুঃখে কাঁদছি। নবী সা: শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরে ফিরে এলেন, তাকে গোসল করিয়ে নতুন পোশাক দিলেন এবং বললেন, আজ থেকে আমি তোমার বাবা, আয়েশা রা: তোমার মা, ফাতেমা রা: তোমার বোন।’ নবীজির আদর পেয়ে শিশুটি তার দুঃখ ভুলে গেল।

ছোট শিশু উমায়েরের একটি ছোট পাখি ছিল। একবার সে বসেছিল, তার কাছে পাখিটি ছিল না। নবীজি সা: তার কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। বললেন, হে উমায়ের, তোমার পাখিটি কোথায়? ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও দ্বীনি শত ব্যস্ততার মধ্যেও নবী সা: শিশুটির পাখির বিষয়টি স্মরণ রেখেছেন বলে শিশুটি অবাক হলো। নবী সা:-এর দুই নাতি ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন রা:-কে নবী সা: কত আদর করতেন তা ইতিহাসখ্যাত। নবীজি ঘোড়ার মতো হামাগুড়ি দিয়ে চলতেন আর নাতিরা নবী সা:-এর পিঠ মোবারকে আরোহণ করতেন। জায়েদ বিন হারেসা রা: শিশুকালে দাস হিসেবে বিক্রি হন। হাত বদল হতে হতে নবী সা:-এর হাতে এসে পড়েন। তার পিতা-মাতা তার খোঁজ পেয়ে তাকে মুক্ত করতে নবী সা:-এর কাছে আসেন। নবী সা: তাকে মুক্ত করে দিয়ে তার পিতা-মাতার সাথে চলে যাওয়ার অথবা নবী সা:-এর কাছে থেকে যাওয়ার যেকোনো একটি গ্রহণের সুযোগ দিলেন। তিনি নবী সা:-এর সাথে থাকার ইচ্ছা পোষণ করলেন। নবী সা:-এর স্নেহের কারণে তিনি এরূপ করেছিলেন। পরে নবী সা: তাকে আপন পালকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। অনেক অসহায় পরিবার অভাবের তাড়নায় শিশুদের বাসাবাড়িতে, গ্যারেজে, শিল্পকারখানার কাজে নিয়োজিত করছে। ছোট মানুষ, কাজে তার কিছু ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সামান্য ভুলের জন্য মালিকপক্ষ অনেক সময় তাদের সাথে নির্দয় আচরণ করেন। আপনার ছোট শিশুটির কথা একটু ভাবুন, তাকে কী এ ধরনের কাজে নিয়োজিত করবেন? আর সেইবা এ বয়সে কতটুকু দক্ষতার সাথে কাজ করতে পারবে?

আবু হোরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূল সা: বলেছেন, কেউ তার অধীনস্থকে (চাকর) অন্যায়ভাবে একটি বেত্রাঘাত করলেও কিয়ামতের দিন তার থেকে তার বদলা নেয়া হবে’ (তাবরানি)। আবু বকর রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী সা: বলেছেন, অধীনস্থদের (চাকর) প্রতি ক্ষমতার অপব্যবহারকারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না’ (ইবনে মাজাহ)।

মনিব যা খায়, যে ধরনের পোশাক পরে দাসদাসীদের একই ধরনের খাওয়া ও পোশাক দেয়ার নির্দেশ ইসলাম দিয়েছে। নবী সা: বলেছেন, ‘তোমাদের কারো খাদেম তার জন্য খাবার নিয়ে এলে তাকে তার সাথে বসিয়ে খাবার খাওয়াতে না পারলে (কমপক্ষে) এক বা দুই লোকমা যেন তার মুখে তুলে দেয়। কারণ সে কষ্ট করে তার জন্য খাবার প্রস্তুত করে এনেছে’ (বুখারি)। দাসদাসী কোনো ভুল করলে ক্ষমা করা উত্তম। আল্লাহ বলেছেন, ‘ক্ষমা প্রদর্শন করো, ভালো কাজের আদেশ দাও, জাহেলদের থেকে বিমুখ থাকো’ (সূরা আরাফ-১৯৯)। হজরত আনাস রা: শিশু বয়সে নবী সা:-এর খাদেম নিযুক্ত হন। তিনি ১০ বছর নবী সা:-এর খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘এ দীর্ঘ সময়ে নবী সা: কখনো হে আনাস, তুমি এটা করলে না কেন? বা ওটা এরূপ করলে কেন? এরূপ বলেননি। তিনি আরো বলেন, একদা নবী সা: একটি কাজে আমাকে এক জায়গায় পাঠালেন। যাওয়ার পথে শিশুরা খেলছে দেখে আমি তাদের খেলা দেখতে লাগলাম এবং কাজের কথা ভুলে গেলাম। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলো। হঠাৎ আমার মাথায় কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে আমি পেছনে তাকিয়ে দেখি নবী সা: আমার মাথায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি ভয় পেয়ে গিয়ে বললাম, আমি এখনি যাচ্ছি। নবী সা: মুচকি হেসে বললেন, তিনি নিজে গিয়ে ওই কাজটি সেরে এসেছেন। তিনি আমাকে একটু রাগও দেখালেন না। ‘আল্লাহ বলেন, ‘অতএব তুমি ইয়াতিমদের প্রতি নির্দয় আচরণ করো না এবং প্রার্থনাকারীকে ধমক দিও না’ (সূরা আদ-দোহা ৯-১০)। নবী সা: বলেছেন, ‘যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের অধিকার আদায় (সম্মান) করে না, সে আমার উম্মত নয়।’

শিশু ও সন্তানদের প্রতি আমাদের কর্তব্যও রয়েছে। শিশু মাতৃগর্ভে আসার পর মায়ের চিন্তাচেতনায় সততা ও ইসলামী ভাবধারা প্রাধান্য পাওয়া উচিত। কারণ তার চিন্তাচেতনা সন্তানের ওপর প্রভাব ফেলে। জন্মের সাথে সাথে ছেলে বা মেয়ে যাই হোক না কেন, তার ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামত দিয়ে তাওহিদের বাণী তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। পূর্ণ দুই বছর মায়ের দুধ পান করা শিশুর অধিকার। আল্লাহ বলেন, ‘গর্ভধারণ ও দুধপানের সময়সীমা ত্রিশ মাস’ (সূরা আহকাফ-১৫)। জন্মের সাত দিনের সময় তার আকিকা করা ও মাথার চুল কামানো সুন্নত, সম্ভব হলে চুলের ওজন পরিমাণ স্বর্ণ বা রৌপ্য অসহায় দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করে দিতে হবে। সালমান ইবনে আমের জাবি রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ‘আমি রাসূল সা:-কে বলতে শুনেছি, সন্তানের আকিকা করা প্রয়োজন। সুতরাং তার পক্ষ থেকে তোমরা রক্ত প্রবাহিত করো, তার থেকে কষ্ট দূর করো’ (বুখারি)। সন্তান পুত্র বা কন্যা যাই হোক ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা নিষেধ। নবী সা: বলেছেন, ‘যার কন্যাসন্তান রয়েছে সে তাকে প্রোথিত করেনি, অবহেলা করেনি, পুত্রসন্তানকে তার ওপর প্রাধান্য দেয়নি আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন’ (আবু দাউদ)।

সন্তানকে দ্বীনি জ্ঞান, নৈতিকতা, সততা শিক্ষা দেয়া প্রত্যেক অভিভাবকের অবশ্য কর্তব্য। সাইদ ইবনুল আস রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূল সা: বলেন, পিতা সন্তানকে যা দান করে এর মধ্যে সর্বোত্তম দান হলো উত্তম শিক্ষা ও উত্তম প্রশিক্ষণ’ (মেশকাত)। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তাই পিতা-মাতা ও মুরব্বিদের নিজেদের সুন্দর আচরণ করতে হবে। তবেই সন্তান তা শিখবে। হজরত আবদুল কাদের জিলানী র: প্রথম দিন মক্তবে গিয়ে মুখস্থ কুরআন ওস্তাদকে শুনিয়ে দিতে লাগলেন। ওস্তাদ তা শুনে অবাক হয়ে ভাবলেন, সে কোথায় তা শিখল? জানা যায়, তার মায়ের কুরআনের আঠারো পারা মুখস্থ ছিল। তার মা তা বেশি বেশি তিলাওয়াত করতেন, তা শুনে শুনে তার মুখস্থ হয়ে গেছে।

শিশুকে সৎ উপদেশ দেয়া প্রয়োজন। লোকমান আ: তাঁর ছেলেকে যে উপদেশ দিয়েছেন কুরআনের ভাষায় তা বর্ণনা করা হয়েছে। ‘হে প্রিয় বৎস! আল্লাহর সাথে শিরক করো না, নিশ্চয়ই শিরক বড় জুলুম। নামাজ কায়েম করবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে, মানুষকে অবজ্ঞা করে মুখ ফিরিয়ে নেবে না, অহঙ্কার করে জমিনে চলবে না, আল্লাহ অহঙ্কারীদের ভালোবাসেন না। নিম্নস্বরে কথা বলবে, গাধার মতো জোরে চিৎকার সবচেয়ে অপছন্দনীয়’ (সূরা লোকমান-১৩ ও ১৬-১৯)। পরিবারকে সুন্দরভাবে পরিচালনা ও সন্তানকে মানুষ করার জন্য ব্যয় করার জন্য নবী সা: গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি সা: বলেন, ‘যে লোক (পরকালে) প্রতিদান পাওয়ার আশায় পরিবার পরিজনের জন্য ব্যয় করে তা তার জন্য সাদকাহ হিসেবে গণ্য হবে’ (বুখারি মুসলিম)। অনেক শিশুকে দেখা যায় ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত, কেউ টোকাই সেজে বাসাবাড়িতে চুরিতে লিপ্ত হয়। নামাজে জানাজা বা ভিড়ের মধ্যে বড়দের পাশে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে মোবাইলসেট, টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেয়। এ বিষয়ে অভিভাবক অনেকাংশে দায়ী। আগেই বলা হয়েছে, শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। নাটক-সিনেমা তাদের বেশি প্রভাবিত করে। এ জন্য পাখি জামা, ঝিলিক জামার জন্য আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। নাটক-সিনেমায় ধূমপান, মদপানের দৃশ্য, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দৃশ্য, শিশুদের ধূমপান, নেশা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দিকে নিয়ে যায়। এ বিষয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল সা:-কে বলতে শুনেছি, ‘সাবধান! তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল, তোমাদের প্রত্যেককে নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে (আখিরাতে) জিজ্ঞাসা করা হবে। দেশের শাসককে তার দেশের নাগরিকদের প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। একজন পুরুষকে তার পরিবারের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। একজন গৃহিণী তার স্বামীর সংসারে সন্তানাদি দেখাশোনার জন্য দায়িত্বশীল। তাকে ওই দায়িত্বের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। চাকরকে তার মনিবের সম্পদ রক্ষা ও অন্য দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। অতএব সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। প্রত্যেককেই নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হবে’ (বুখারি)।

তাই আসুন, আমরা শিশুদের প্রতি সদয় হই। ঝুঁকিপূর্ণ ও অনৈতিক কাজে তাদের নিযুক্ত না করি, তাদের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তাদের আদর্শ, সৎ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলে ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে সুন্দর করার পথ সুগম করি।

অধ্যক্ষ মো: ইয়াছিন মজুমদার
লেখক : অধ্যক্ষ, ফুলগাঁও ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসা, লাকসাম, কুমিল্লা

আপনার মন্তব্য দিন

শেয়ার