কাজের বুয়া নিয়োগে কিছু বিশেষ সতর্কতা

‘দুর্ধর্ষ পারভীন’! সে অভিজাত এলাকায় কাজের বুয়া হয়ে বাড়ির লোকদের নেশাদ্রব্য খাইয়ে অজ্ঞান করে সর্বস্ব লুঠ করে নিয়ে যেত। ডিএমপি’র গোয়েন্দা বিভাগ তাকে গ্রেফতার করে। সংসারের কাজে সাহায্য করার জন্য কাজের বুয়া নিতে বাধ্য। একটু সচেতন হলেই আপনার বাসায় আর কোন পারভীন ঘাঁটি গাঁড়তে না পারবে না।

এজন্য কাজের বুয়া/ কাজের লোক নিয়োগের আগে যা করবেনঃ

১। কাজের বুয়া/কাজের লোক নিয়োগের আগে তার নিকট হতে জাতীয় পরিচয় পত্র, সদ্য তোলা রঙ্গিন ছবি, সনাক্তকারী ব্যক্তি, ব্যক্তির পরিচয় ও তার জাতীয় পরিচয় পত্র নিন।

২। সমস্ত তথ্য নেয়ার পর নিকটস্থ থানায় কাজের বুয়া/ কাজের লোকের তথ্য প্রদান করুন এবং নিজের কাছে রাখুন। তাতে করে সে যদি পূর্বে কোন অপরাধ করে থাকে তাহলে পুলিশ তাকে সহজে সনাক্ত করতে পারবে।

৩। পূর্ববর্তী সময়ে সে কোথায় কাজ করেছে তার বিস্তারিত তথ্য নিন এবং কাজ ছাড়ার কারণ জানার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে পূর্বের কাজের ঠিকানায় যোগাযোগ করে তার তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন।

৪। কাজের বুয়া/ কাজের লোকের পরিবারে তথ্য নিন। তার স্থায়ী ঠিকানা ও পরিবারে কে কে আছে তা জানার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে তার স্থায়ী ঠিকানায় যোগাযোগ করে দেখতে পারেন, সে আসলে ঐ ঠিকানায় বসবাস করে কি না। এত কিছু খোঁজ খবর অনাবশ্যক মনে হতে পারে। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হলে তখন আফসোসের অন্ত থাকবে না।

৫। বর্তমানে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ নগরীর সকল মানুষের তথ্য সংরক্ষণের কাজ করছে। ডিএমপি কর্তৃক নির্ধারিত তথ্য ফরমে আপনার কাজের বুয়া/ কাজের লোকের তথ্য পূরণ করে থানায় জমা দিন।

কাজের বুয়া/ কাজের লোক নিয়োগের পরে যা করবেনঃ

১। নিয়োগের পর তার গতিবিধি লক্ষ্য করুন। তার চালচলনে আপনি বুঝতে পারবে সে আসলে কেমন ব্যক্তি।

২। বাসার মেইন গেইটে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে পারেন। এতে করে আপনার বাসায় কোন অপরিচিত লোকের আনাগোনা হচ্ছে কি না তা দেখতে সহজ হবে। প্রয়োজনে ঘরের ভেতরেও সিসি ক্যামেরা লাগানো যেতে পারে যাতে আপনার অনুপস্থিতিতেও কাজের বুয়ার কর্মকান্ড মনিটর করতে পারেন।

৩। বাসায় মূল্যবান জিনিসপত্র, স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা কাজের বুয়া/ কাজের লোকের অগোচরে রাখুন। আপনার লকারের চাবি সবসময় আপনার কাছে রাখার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে যে রুমে লকার/আলমারি রয়েছে সে রুম আলাদাভাবে লক করে রাখুন।

৪। বাড়িতে কাজের বুয়া/ কাজের লোককে একা রেখে সবাই বাড়ি ছেড়ে যাবেন না। বাচ্চা রেখে গেলে সাথে আরও একজনকে রাখুন। কোন অবস্থাতেই বাচ্চাকে একা রেখে যাবেন না।

৫। কাজের বুয়ার চাহিদা বুঝার চেষ্টা করুন। তাতে করে সে লোভী কি না জানতে সহজ হবে।

৬। সন্দেহজনক কারোর সাথে কাজের বুয়া মোবাইলে কথা বলে কি না অথবা তার কাছে সন্দেহজনক কেউ দেখা করতে আসে কি না এ বিষয়ে লক্ষ্য রাখুন।

৭। বাড়িতে গ্যাসের চুলা, ইলেক্ট্রিক যন্ত্রাংশ ব্যবহারে কাজের বুয়া/ কাজের লোক সতর্ক রয়েছে কি না লক্ষ্য করুন। অসতর্কতার ফলে যেকোন বড় ধরণের দূর্ঘটনা ঘটতে পারে।

৮। কাজের লোক/বুয়াকে নিয়ে কোথাও ভ্রমনে গেলে সবসময় সাথে সাথেই রাখুন। সে হারিয়ে গেলে বা কোন দূর্ঘটনা ঘটলে আপনাকেই বিড়ম্বনায় পড়তে হবে।

৯। সর্বশেষ, আপনার বাসার কাজের লোক/বুয়ার সাথে মানবিক আচরণ করুন।

আপনার সচেতনতাই রুখতে পারে কাজের বুয়া/ কাজের লোকের অপরাধের তৎপরতা। কাজের বুয়া/ কাজের লোককে অতি বিশ্বাস না করাই শ্রেয়। তাদেরকে নজরদারীতে রাখুন আপনার স্বার্থেই। আপনার যেকোন প্রয়োজন ও সমস্যায় যোগাযোগ করুন নিকটস্থ থানা বা ফাঁড়ির পুলিশের সাথে।

সাদাপোশাকে গ্রেপ্তার করতে এলে কী করবেন?

হঠাৎ করে সাদাপোশাকধারী কিছু লোক এসে যদি আপনাকে বলে যে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। আপনাকে তাদের সঙ্গে যেতে হবে, আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। আপনি কিছু না বুঝে ওঠার আগেই তারা আপনাকে গ্রেপ্তার করে বসল। অথচ আপনি কোনো অপরাধই করেননি। কিংবা ঘটনাটি আপনার সঙ্গে না ঘটে কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে ঘটল। এ অবস্থায় কী করার আছে আপনার? আপনার কি কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিকার পাওয়া সম্ভব কিংবা কীভাবে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করবেন?

এমন পরিস্থিতির শিকার হলে
প্রথমেই মনে রাখতে হবে দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনার জানার অধিকার রয়েছে কেন, কী কারণে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তাই প্রথমেই জানতে চাইতে হবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগটি কী? অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তাদের পরিচয় জানতে চাইবেন এবং তাদের পরিচয়পত্র দেখতে চাইবেন। একা একা কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে পরিবার-পরিজনকে সঙ্গে সঙ্গে খবর দিন। প্রয়োজনে আশপাশের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীদের খবর দিন এবং যত পারা যায় লোকজন জড়ো করার চেষ্টা করুন।

আপনার বিরুদ্ধে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে কি না, তা দেখতে চাইবেন। যদি তারা আপনাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে চায়, তাহলে আপনি একা তাদের সঙ্গে যাবেন না বলে তাদের জানিয়ে দেন এবং পরিবারের দু-একজনকে সঙ্গে নেবেন বলে তাদের জানান। প্রয়োজনে নিকটস্থ থানায় ফোন করে আপনার গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানান। এবং থানা এ সম্পর্কে অবগত অছে কি না, তা জানার চেষ্টা করুন। আপনার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ দেখাতে না পারলে আপনাকে হয়তো ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তারের কথা বলতে পারে। ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার নিয়ে ২০১৬ সালের ২৪ মে আপিল বিভাগ রায় দিয়েছেন এবং কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, যা ১০ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে পূর্ণাঙ্গ রায় হিসেবে প্রকাশিত হয়।

আপিল বিভাগের নির্দেশনা
আপিল বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ গ্রেপ্তারের কারণ জানাতে বাধ্য থাকবে এবং পুলিশের পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য থাকবে। গ্রেপ্তারের স্থান ও সময় ব্যক্তির স্বাক্ষরসহ গ্রেপ্তারের পরপরই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এ বিষয়ে একটি মেমোরেন্ডাম তৈরি করবেন। গ্রেপ্তারের সময় ও স্থান এবং আটক রাখার জায়গা গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির আত্মীয়কে জানাতে হবে। আত্মীয়স্বজন না পেলে ব্যক্তির নির্দেশনা মেনে তাঁর বন্ধুকে জানাতে হবে। এ জন্য সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টা সময় পাওয়া যাবে। কোন যুক্তিতে, কার তথ্যে বা অভিযোগে ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, ঠিকানাসহ তা কেস ডায়েরিতে লিখতে হবে, আটক ব্যক্তি কোন কর্মকর্তার তদারকিতে রয়েছেন, তাও উল্লেখ করতে হবে। বিশেষ ক্ষমতা আইনে কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করা যাবে না। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির শরীরে কোনো আঘাত থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে তা রেকর্ড করে চিকিৎসার জন্য তাঁকে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কাছ থেকে সনদ নিতে হবে।

জামিনের জন্য চেষ্টা করতে হবে
গ্রেপ্তার হলে গ্রেপ্তারের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আপনাকে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চালান দেবেন। ২৪ ঘণ্টা সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর কোনো অবস্থাতেই (ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া) পুলিশ আপনাকে আটক রাখতে পারবে না। এ সময় পুলিশ আপনাকে গুরুতর কোনো অভিযোগে রিমান্ডের আবেদন করতে পারে। আপিল বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী ডায়েরির অনুলিপি ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাউকে আদালতে হাজির করে আটকাদেশ চাইলে ম্যাজিস্ট্রেট, আদালত, ট্রাইব্যুনাল একটি বন্ড গ্রহণ করে তাঁকে মুক্তি দেবেন। আটক থাকা কোনো ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট মামলায় যদি গ্রেপ্তার দেখাতে চায়, সে ক্ষেত্রে যদি ডায়েরির অনুলিপিসহ তাঁকে হাজির না করা হয়, তাহলে আদালত তা মঞ্জুর করবেন না। কোনো কারণে নিম্ন আদালতে জামিন না হলে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে।

লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

আপনার মন্তব্য দিন

শেয়ার