আল বেরুনীর ভারত

মুসলমানদের মধ্যে ইতিহাসচর্চার উন্মেষ ঘটে সাহিত্যচর্চা ও পদ্য রচনাকে ভিত্তি করে। মুসলিম কবি, সাহিত্যিকরা সমকালীন বিভিন্ন ঘটনা তাদের রচনার মাধ্যমে তুলে ধরতেন। হজরত মুহাম্মদ সা:-এর জীবনী এবং হাদিস লিপিবদ্ধ করার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের ইতিহাস চর্চার বিকাশ ঘটতে থাকে। পরবর্তী সময়ে মুসলিম ঐতিহাসিকরা বিভিন্ন যুদ্ধের বিবরণ, আরবীয়দের বিভিন্ন রীতিনীতি লিপিবদ্ধ করে ইতিহাস রচনার ধারা অব্যাহত রাখেন। মুসলিম ঐতিহাসিকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ঐতিহাসিক আবু রায়হান আল বেরুনী। তিনি অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। গজনীর অধিপতি সুলতান মাহমুদের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি কিতাব-উল-হিন্দ নামে একটি বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থটি আলোচনা তৎকালীন সময়ের একটি প্রামাণ্য দলিল। আমাদের আলোচনা ঐতিহাসিক আল বেরুনীর বিখ্যাত গ্রন্থ কিতাব-উল-হিন্দ-এ ভারত সম্পর্কিত তথ্যের সংক্ষিপ্ত অংশ তুলে ধরেছেন নাজনীন নাহার

আবু রায়হান আল বেরুনী : ঐতিহাসিক আবু রায়হান আল বেরুনী জন্মগ্রহণ করেন ৯৭৩ সালে ইরানের উত্তরাঞ্চলের খারিজম রাজ্যে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অসম্ভব মেধাবী। তার লেখাপড়ার জীবনকাল অতিবাহিত হয় খিরামে। যৌবনের শুরুতেই তিনি চলে আসেন তাবারিস্থানে। তখন তাবারিস্থানের শাসনকর্তা ছিলেন শামসুল মাআলি কাবুম। এখানে তিনি ১০০০ সাল পর্যন্ত অবস্থান করেন। তিনি ছিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক। তার পৃষ্ঠপোষকতায় তাবারিস্থান জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক বিশিষ্ট স্থানে উন্নীত হয়। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন দার্শনিক চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী ইবনে সিনা।

মধ্যযুগের শাসনকর্তাদের পণ্ডিতভীতি ছিল প্রবল, কারণ রাজ্য জয় এবং শাসন পরিচালনার প্রধান উপদেষ্টা থাকতেন এই পণ্ডিতরা। এই সময় গজনীর শাসনকর্তা ছিলেন সুলতান মাহমুদ। তিনি তাবারিস্থানের সব পণ্ডিতকে গজনীতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ইবনে সিনাসহ আরো কয়েকজন সেখান থেকে পালিয়ে যান। আল বেরুনী সুলতান মাহমুদের দরবারে এসে উপস্থিত হন। সুলতান মাহমুদ তখন ভারতবর্ষে পুনঃ পুনঃ অভিযানে ব্যস্ত। তিনি আল বেরুনীকে সাথে করে নিয়ে আসেন। সুলতান মাহমুদ ভারত বর্ষের মানুষ, সমাজ, জীবনধারা, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, ভাষা-সাহিত্যের বিকাশ, ভৌগোলিক অবস্থান এবং সর্বোপরি ভারতীয়দের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সম্পর্কে পরিপূর্ণ তথ্য আহরণ করে সুলতান মাহমুদকে লিখে দেয়ার নির্দেশ দেন। পণ্ডিত আল বেরুনী সুলতান মাহমুদের নির্দেশে দীর্ঘকাল ভারত গবেষণায় মগ্ন থাকেন। ১০৩০ খ্রিষ্টাব্দে সেপ্টেম্বর মাসে তিনি কিতাব-উল-হিন্দ লেখা শেষ করেন। এ সময় ছিল সুলতান মাহমুদের মৃত্যুর পাঁচ মাস পর। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র মাসুদ (১০৩০-১০৪১) ক্ষমতায় আসেন। এ সময়ও আল বেরুনী তার গবেষণাকাজ চালিয়ে যান। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, আল বেরুনীর মৃত্যু হয় ১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দে। তবে কারো কারো মতে, তার মৃত্যু হয় ১০৫০ সালে। এ ব্যাপারে আবু মহামেদ হাবিবুল্লাহর নির্ধারিত তারিখটি (১০৫০ খ্রি.) সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। তৎকালীন ভারতের সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আল বেরুনীর তত্ত্ব উপস্থাপন করা হলো :

ঈশ্বর সম্পর্কে ভারতীয়দের ধারণা : ঈশ্বর সম্পর্কে ভারতীয়দের ধারণা এই যে, তিনি এক, চিরন্তন, অনাদি, অনন্ত, স্বাধীন, সর্বশক্তিমান সমস্ত জ্ঞানের আকর, চিরঞ্জীব, প্রাণদাতা, সর্বনিয়ন্তা ও সৃষ্টিপালক। তিনি সমস্ত সাদৃশ্য বা বৈপরীত্যের অতীত, তার শক্তির তুলনা তিনিই। কিছুই তার মতো নয়, তিনিও কোনো কিছুর মতো নন। ভারতীয়দের মতে ‘ঈশ্বর’ যিনি পরমদাতা, যিনি দান করেন কিন্তু প্রতিগ্রহণ করেন না। তাদের মতে, ঈশ্বরের ঐক্য হচ্ছে অনংড়ষঁঃব এবং আপাতদৃষ্টিতে অন্যান্য বস্তু ভিন্ন মনে হলেও আসলে তারা একেরই বহু রূপ। ওরা আরো মনে করে যে, ঈশ্বরের অস্তিত্বই প্রকৃত অস্তিত্ব, কারণ অন্য সব কিছুর অস্তিত্ব তার থেকেই পাওয়া।

ভারতীয় সমাজ এবং সমাজের বর্ণবিভাজন : তৎকালীন ভারতে প্রধানত চারটি বর্ণের মানুষ বসবাস করত। আল বেরুনীর তত্ত্ব মতে, সর্বোচ্চ বর্ণ ছিল ব্রাহ্মণের। তাদের গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ব্রহ্মার মস্তক থেকে ব্রাহ্মণের সৃষ্টি। সে জন্য ব্রাহ্মণ সব প্রাণীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এদের নিম্নশ্রেনীর শ্রেণী হলো ক্ষত্রিয়। ভারতীয়দের বিশ্বাস মতে, ব্রহ্মার স্কন্ধ ও বাহু থেকে ক্ষত্রিয়ের সৃষ্টি। তার নিচে রয়েছে বৈশ্য ব্রহ্মার ঊরুদেশ থেকে যাদের সৃষ্টি। চতুর্থ শ্রেণীতে রয়েছে শূদ্র। ব্রহ্মার চরণ থেকে যাদের সৃষ্টি। ভিন্ন শ্রেণীর হলেও এই চার শ্রেণীর লোকেরা নগর ও গ্রামে মিলেমিশেই বসবাস করত। এদের নিচে আছে শ্রমজীবীরা। এদেরকে কোনো বিশেষ বর্ণ বলে গণ্য করা হয় না। জীবিকা অনুযায়ী এদেরকে আট শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। এরা হচ্ছে রজক, চর্মকার, বাজিকর, ঝুড়ি ও ফাল নির্মাতা, নৌবাহক, মৎস্যজীবী, ব্যাধ ও তন্তুরায়। চতুর্বর্ণের লোকরা এদের সাথে এক স্থানে বসবাস করে না। পেশার সাদৃশ্য অনুযায়ী এরা পরস্পরের সাথে মেলামেশা ও বিবাহাদি করে থাকে। এরা সবাই মিলে এক শ্রেণী। এদেরকে জারজ সন্তানও বলা হতো। ভারতীয়দের বিশ্বাস মতে, এরা হচ্ছে শূদ্র পিতা ও ব্রাহ্মণ মাতার ব্যভিচারের ফল। এ ছাড়া তৎকালীন ভারতীয় সমাজে ইষ্টি, অগ্নিহোত্রি ইত্যাদি উপাধি বিদ্যমান ছিল। এদের সবার জন্যই বিভিন্ন ধরনের পেশা বা কাজ নির্দিষ্ট ছিল।

প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন হিন্দু গ্রন্থ : হিন্দুদের মতে, ‘বেদ’ হচ্ছে ব্রহ্মার মুখনিঃসৃত ঐশ্বরিক বাণী। বেদকে চার খণ্ডে ভাগ করা হয়। ঋগে¦দ ঋগ ছন্দে রচিত পদের সমষ্টি বলে এর নাম হয় ঋগে¦দ। যজুর্বেদ যজুর ছন্দে রচিত পদের সমষ্টি বলে এর নাম হয় যজুর্বেদ। সামবেদ যেখানে যজ্ঞাদি ও বিধিনিষেধ বর্ণনা করা হয়েছে। অথর্ববেদ যাগযজ্ঞ এবং তার সাথে মৃতের আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্মের নির্দেশ আছে। তারপর পুরাণ। পুরাণের সংখ্যা আঠারো। এগুলো হলো আদি পুরাণ, মৎস্য, কর্ম, বরাহ, নরসিংহ, কমন, বায়ু, নন্দ, স্কন্দ, আদিত্য, সোম, মাম্ব, ব্রহ্মাণ্ড, মার্কেণ্ডের, তরিক্ষ, বিষ্ণু, ব্রহ্ম এবং ভবিষ্য পুরাণ। এ ছাড়া শাস্ত্র, বিধান, ঈশ্বরতত্ত্ব, সন্ন্যাস দেবত্বলাভও সংঘার থেকে নিষ্কৃতি বিষয়ে ভারতীয়দের আরো অনেক গ্রন্থ আছে। ভারতীয়দের একটি মহাগ্রন্থ হলো ভারত। এই ভারত গ্রন্থটি আবার আঠারো খণ্ডে বিভক্ত। এর আঠারো খণ্ডের পর আরো একটি খণ্ড আছে যার নাম হরিবংশ পুরাণ

ভারত বর্ষের নদনদী ও সীমারেখা : ভারতের উত্তরে রয়েছে তুষারাবৃত হিমারন্ত পর্বত। ভারত বর্ষের নদীগুলো উত্তরের হিম পর্বতমালা থেকেই উৎসারিত। কাবুলসংলগ্ন পর্বত থেকে যে নদী প্রবাহিত হয়েছে তার নাম ‘ঘোর ওয়ানদ’। তার অনেক শাখা-প্রশাখা আছে। পেশোয়ার নগরের মুখে এই নদী বিরাট আকার ধারণ করে। ঝিলম নগরের নামে বিয়ত্ত্ব নদী ‘ঝরাওয়ার’ পঞ্চাশ মাইল ওপরে ‘চন্দ্রাহা’ নদীর সাথে মিলিত হয়ে মুলতানের পশ্চিম দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এবং ‘বিয়াম’ নদী মুলতানের পূর্ব দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ওই নদীদ্বয়ের সাথে মিলিত হয়েছে। এরপর ‘ইরাবতী’ নদী ও শতদ্রু নদী তাদের সাথে মিলিত হয়ে মুলতানের নিচে পঞ্চনদ নামক স্থানে মিলিত হয়ে বিরাট আকার ধারণ করে। সরমতি নদী হিমাবন্ত থেকে উৎপন্ন হয়ে সাগরে পড়েছে। যমুনার জল কর্নোজের নিচে এসে গঙ্গায় মিশেছে।
হিন্দুদের বিশ্বাস মতে, পুরাকালে গঙ্গায় প্রবাহপথ স্বর্গে ছিল। মৎস্যপুরাণে আছে, ধরা স্পর্শ করার পর গঙ্গা নিজ ধারাকে সাতটি শাখায় ভাগ করে দিলো, যার কেন্দ্রস্থ ধারাটি প্রধানত গঙ্গা নামে অভিহিত।

ভারতীয়দের দৃষ্টিতে পৃথিবীর জনবসতি : পৃথিবীর যে মানববসতি হিমাবন্ত থেকে দক্ষিণের দিকে বিস্তৃত তার নাম ভারত বর্ষ। ‘ভরত’ নামে একটি লোকের নাম থেকে সে অঞ্চলের নাম ভারতবর্ষ হয়েছে। হিন্দুদের মতে, তাদের দেশটাই পৃথিবী এবং তারাই একমাত্র মানবজাতি। বায়ু পুরাণে আছে ‘জম্বুদ্বীপের কেন্দ্র এই ভারতবর্ষ’। তাদের চারটি যুগ আছে। তারা কর্মের নিয়মাধীন, হিমাবন্ত তাদের ওপরে অবস্থিত। ভারত বর্ষ নয় খণ্ডে বিভক্ত। খণ্ডগুলোর মধ্য দিয়ে নৌচলাচল উপযোগী নদী প্রবাহিত। ভারত বর্ষের দৈর্ঘ্য ৯০০০ যোজন, আর প্রস্থ ১০০০ যোজন। এই নয়টি ভাগ হলো এই রূপ :
নাগদ্বীপ দক্ষিণ তাম্রবর্ণ গভস্তিমত পশ্চিম সৌম্য মধ্যদেশ ক্ষিরৌম্য পূর্ব গান্ধর্ব নাগরমম্বৃত্ত উত্তর
বায়ু পুরাণে দেশগুলোর যে নাম দেয়া হয়েছে তা কেবল চার দিক অনুযায়ী সাজানো হয়েছে। আর সংহিতায় উল্লিখিত দেশের নামগুলো আট দিকে ভাগ করে দেখানো হয়েছে। বায়ু পুরাণে উল্লিখিত কেন্দ্রীয় অঞ্চলের জনপদগুলো :
কুরু, পাঞ্চাল, সল্য, জঙ্গাল, সুরসেন, ভদ্রভাল, সুতা, পথেশ্বর, সচ্চি, কুসত, কুস্ত, কুম্ভবল, কাশী, কোশল, অর্থয়াস্ব, ফুলিঙ্গ, মশক ও বৃক। এ ছাড়া অন্যান্য জাতিকে ভাগ করা হয়েছে নিম্নরূপে পূর্ব দিকের জাতি, দক্ষিণের জাতি, পশ্চিমের জাতি, উত্তরের জাতি ইত্যাদি।
বরাহ মিহির রচিত সংহিতা থেকে উদ্ধৃত কুর্মচক্রের অন্তর্গত দেশবাসীর নাম। যথা : কেন্দ্রের দেশ, পূর্ব দিকের দেশ, অগ্নিকোণের দেশ, দক্ষিণের দেশ, নৈঋত কোণের দেশ, পশ্চিমের দেশ, বায়ব কোণের দেশ, উত্তরের দেশ, ঈশান কোণের দেশ ইত্যাদি। ভারতীয় জ্যোতিষীরা লঙ্কা থেকে পৃথিবীর জনপদ ভাগের দ্রাঘিমা নির্ণয় করে।

ভারতীয়দের দৃষ্টিতে আকাশবিজ্ঞান : ভারতীয়দের মতে, আকাশ ও বিশ্বজগৎ বৃত্তাকার এবং পৃথিবীর আকৃতি গোলকের ন্যায়, তার উত্তরার্ধ শুষ্ক, দক্ষিণার্ধ জলমগ্ন। হিন্দুরা পৃথিবীকে বিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থিত মনে করে এবং যেহেতু সব ভারী বস্তু তার দিকে আকৃষ্ট হয় সে জন্য আকাশকেও গোলাকৃতি মনে করতে ওরা বাধ্য হয়েছে। বিভিন্ন সময় নক্ষত্রের উদয় অস্ত বিভিন্ন সময়ে হওয়াতে আকাশ ও পৃথিবীকে তারা বর্তুলাকার ভেবেছে। তা ছাড়া আকাশ ও পৃথিবী বর্তুলাকার না মনে করলে জ্যোতিষের কোনো গণনাই শুদ্ধ হয় না। তাই বাধ্য হয়েই তারা বলে আকাশ বর্তুলাকার। কারণ গোলকের সব বৈশিষ্ট্যই এতে বিদ্যমান আছে। মৎস্য পুরাণে আছে সূর্য ও চন্দ্র মেরুর চতুর্দিকে আবর্তিত হয় যার দরুন মেরুবাসীদের পূর্ব বা পশ্চিম বলে কিছু নেই। তাদের দৃষ্টিতে সূর্য একই নির্দিষ্ট স্থানে উদিত না হয়ে বিভিন্ন স্থানে উদয় হয়। মানবদৃষ্টি পৃথিবী থেকে তার ৫০০০ যোজনীব্যাপী গোলকের ৯৬তম ভাগ অর্থাৎ ৫২ যোজনের অধিক দূরে যেতে পারে না। ফলে মানুষ পৃথিবী ও আকাশের বর্তুলাকৃতি দেখতে পায় না। পৃথিবী ও আকাশ সম্পর্কে ভারতীয়দের আরো একটি ধারণা হলোÑ পৃথিবী নিশ্চল। ‘ব্রহ্মসিদ্ধান্তে’ ব্রহ্মগুপ্ত বলেছেন, অনেকের মত, যে পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী যে প্রাথমিক গতি তা মধ্যরেখার গতি নয় তা আসলে পৃথিবীর গতি।

জোয়ারভাটা ও চন্দ্র-সূর্যগ্রহণ : ভারতীয়রা জোয়ারভাটাকে ওদের ভাষায় ‘ভর্ণ’ ও ‘বুহর’ বলত। হিন্দু জনসাধারণের ধারণা যে, সমুদ্রে ‘বাড়বানল’ নামে একপ্রকার অগ্নি আছে, যা সর্বদাই শ্বাস ফেলছে। শ্বাস গ্রহণ করে বাতাসে তা ছড়িয়ে দেয়ার ফলে সমুদ্রে জলোচ্ছ্বাস হয়। আর শ্বাস ত্যাগ করার দরুন বাতাসে ছড়ানো বন্ধ হয় বলে সমুদ্রে জোয়ার-ভাটা হয়।
তৎকালীন ভারতীয়দের মতে, রাহু দৈত্যদের একজন ছিল। তার মাতার নাম সিংহিকা। দেবতারা সমুদ্র থেকে অমৃত উত্তোলন করার পর বিষ্ণুকে তাদের মধ্যে সে অমৃত ভাগ করে দিতে বললেন। বিষ্ণু যখন তা করছিলেন, তখন দেবতার রূপ ধরে রাহু এসে তাদের সাথে যোগ দিলো। বিষ্ণু তাকেও অমৃতের ভাগ দিলে সে নিয়ে পান করে ফেলে। তার সত্য পরিচয় পেয়ে বিষ্ণু তার মুণ্ড ছেদন করেন। মুখে তখনো অমৃত থাকার দরুন তার মস্তকটি জীবিত থাকল। কিন্তু তা গলাধকরণ দ্বারা দেহে তার শক্তি সঞ্চারিত হয়নি বলে দেহের মৃত্যু হলো। ছিন্নমুণ্ডটি কেঁদে বলল, কী দোষে আমাকে এরূপ করা হলো? তার ক্ষতিপূরণস্বরূপ তাকে ঊর্ধ্বে উঠিয়ে আকাশবাসীর একজন করে দেয়া হলো।
আদি পিতা ব্রহ্মা তাকে আদেশ করেছিলেন গ্রহণকাল ব্যতীত কখনো সে যেন আবির্ভূত না হয়।

ব্রাহ্মণ ও অব্রাহ্মণদের জীবনধারা : সাত বছর বয়োঃক্রমের ঊর্ধ্বে ব্রাহ্মণদের জীবনকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথম ভাগ অষ্টম বছরে আরম্ভ হয় যখন ব্রাহ্মণরা কর্তব্য ও উপদেশ শিক্ষা দেয়। ব্রাহ্মণের জীবনের এই প্রথম ভাগ ২৫ বছর পর্যন্ত থাকে। কোথাও কোথাও ৪৮ বছর বয়সের কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগ শুরু হয় ২৫ থেকে ৫১ বছর, কোথাও ৭০ বছর পর্যন্ত। এ সময় সে বিবাহ করবে, সংসার পাতবে, এবং বংশ রক্ষার সঙ্কল্প করবে। কিন্তু মাসে মাত্র একবার স্ত্রীর ঋতুস্নানের পর সঙ্গম করবে। তবে দ্বাদশ বৎসরোর্ধ্ব কন্যা বিবাহ ব্রাহ্মণের জন্য নিষিদ্ধ। তৃতীয় ভাগ শুরু ৫০ থেকে ৭৫ বছর বিষ্ণু পুরাণ মতে, ৯০ বছর বয়স পর্যন্ত। জীবনের এই পর্যায়ে সে ব্রহ্মাচারী হবে, স্ত্রী তার সাথে বনে যেতে না চাইলে তাকে পুত্রের হাতে সমর্পণ করে গৃহসংসার ত্যাগ করে জনপদের বাইরে গিয়ে প্রথম ভাগের মতো জীবনযাপন করবে। কখনো ছাদের নিচে বসবাস করবে না এবং লজ্জা নিবারণের জন্য যতটুকু প্রয়োজন তা ছাড়া আর কিছু পরিধান করবে না। আর আয়ুর শেষ অবধি চতুর্থ পর্যায়। এ সময় সে মন থেকে কাম, লোভ, ক্রোধ সম্পূর্ণ নির্মূল করবে; একান্ত নিঃসঙ্গে বাস করবে। পরিধানের পথ সন্ধান ব্যতীত তার অন্য কোনো চিন্তা থাকবে না।

ক্ষত্রিয় বেদ পাঠ ও অধ্যয়ন করবে কিন্তু শিক্ষা দেবে না। সে জনতাকে শাসন করবে এবং তাদের রক্ষা করবে। বৈশ্যের কর্তব্য কৃষিকর্ম, ভূমিকর্ষণ, পশুপালন ও ব্রাহ্মণের অভাব মোচন। দুই সুতার একটি মাত্র উপবীত সে ধারণ করতে পারবে। আর শূদ্র ব্রাহ্মণের দাসস্বরূপ। ব্রাহ্মণের গৃহকর্ম ও সেবাতে নিয়ত থাকাই তার ধর্ম।

ভারতীয় মানুষের খাদ্যাভ্যাস : ভারতীয়রা সাধারণ খাদ্য গ্রহণ করত। হিন্দুদের জন্য এক কালে প্রাণিহত্যা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু মাংসের প্রতি মানুষের প্রচণ্ড লোভ থাকায় তারা এ নিয়ম মানেনি। ফলে এ নিয়ম শুধু ব্রাহ্মণদের জন্য প্রযোজ্য হয়; কারণ ব্রাহ্মণরা ছিল এ ধর্মের রক্ষক। কয়েক প্রকারের পশু শ্বাসরুদ্ধ করে মারার অনুমতি আছে। তবে এগুলোর মৃত্যু আকস্মিকভাবে হলে তার মাংসভোজন নিষিদ্ধ। পশুগুলো হলো ছাগল, হরিণ, গণ্ডার, মহিষ, মৎস্য, চড়াই, ঘুঘু, তিতির, ময়ূর প্রভৃতি যা মানুষের জন্য অনিষ্ঠকর নয়। যেসব মাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ তা হলো গরু, ঘোড়া, গাধা, উট, হাতি, গৃহপালিত পক্ষী, কাক প্রভৃতি। ডিম্ব মাত্রই নিষিদ্ধ। মদ কেবল শূদ্রের জন্যই প্রযোজ্য। মাংসের মতো মদ বিক্রয়ও ব্রাহ্মণদের জন্য নিষিদ্ধ।

ভারতীয়দের উত্তরাধিকার আইন : হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের মতে, কন্যা ব্যতীত সব স্ত্রীলোক উত্তরাধিকার থেকে বাদ যাবে। কন্যা পুত্রের এক-চতুর্থাংশ পাবে। অবিবাহিতা থাকলে সে অংশ থেকে বিবাহ পর্যন্ত তার ভরণপোষণ করা হবে এবং তার বিবাহের যৌতুকাদি ক্রয় করা হবে। তারপর পৈতৃক সম্পত্তিতে আর কোনো স্বত্ব থাকবে না। মৃতের স্ত্রী যদি সহমৃতা না হয় তবে তার আজীবন ভরণপোষণ করবে মৃতের উত্তরাধিকারী। মৃতের উত্তরাধিকারীকে তার ঋণ পরিশোধ করতে হবে, মৃত ব্যক্তি সম্পত্তি রেখে যাক বা না যাক। আসল উত্তরাধিকারী হবে পুত্র বা পৌত্ররা। মৃতের কোনো উত্তরাধিকারী না থাকলে তার সম্পত্তি রাজকোষে জমা হবে। তবে এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তি ব্রাহ্মণ হলে তার সম্পত্তি হস্তক্ষেপের অধিকার রাজারও থাকবে না। তা কেবল দান-খয়রাতে ব্যয় করা হবে। উত্তরাধিকার আইনের ক্ষেত্রে নপুংষককে পুরুষ হিসেবে গণ্য করা হবে।

আল বেরুনীর ভারত-তত্ত্ব গ্রন্থটি নানা দিক দিয়ে একটি তথ্যসমৃদ্ধ ও জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ। তিনি তার সন্ধানী ও সংবেদনশীল দৃষ্টিকে প্রসারিত রেখে ভারতবর্ষের মানুষ, তার অতীত ও বর্তমান, মানবসমাজের চার পাশের প্রকৃতি ও পরিবেশ ইত্যাদি যেমন দেখেছেন তার একটি নিখুঁত ও নিরপেক্ষ বর্ণনা উপস্থাপন করেছেন। তার প্রতিটি বর্ণনায় ও আলোচনায় যে পরিপক্ব জ্ঞানের ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন মনীষার পরিচয় পাওয়া যায় তা সত্যি বিস্ময়কর।

আপনার মন্তব্য দিন

শেয়ার