অবৈধ বিয়ে

আমাদের নিচ তলায় এক ব্যাচেলর এসেছে..
এর আগেও অনেক এসেছেন তবে এই ব্যক্তি একটু ভিন্ন ধরনের।
খাঁটি ধার্মিক বলা যায়।
সবসময় পা পর্যন্ত পাঞ্জাবি, আবার কম বয়সে দাড়ি ও রেখছে।

প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙে তার ডাক শুনে.
নামাজ পড়তে উঠায় সবাইকে।

ধীরে ধীরে আমার আর আমার বান্ধবীদের হাসির পাত্রই হয়েগিয়েছিল সে।

আমরা সদ্য কলেজে পড়ুয়া। যা কিছু পাই তাই নিয়ে মজা নিতে পছন্দ করি।
গতকাল জানলাম তার নাম ইকবাল।সে গনিত নিয়ে অনার্স করছে।
যেমন চলা ফেরা আমি ভেবেছিলাম ইসলামী ইতিহাস হবে হয়তো..

বাবা ইকবাল এর সাথে রোজ নামাজে যেতে যেতে ভালো সম্পর্কই হয়ে গিয়েছিল।

বাবা প্রায় ই আমায় দিয়ে ইকবাল কে খাবার পাঠাতো।
আমি খাবার নিয়ে গিয়ে দরজা নক করলে দরজা খুলতো ৩০মিনিট পর।
কি যে করে আল্লাহ ই ভালো জানে।

দরজা খুলেই সালাম।
আমি কোন ভাবে সালাম এর উত্তর নিতাম।লজ্জাও লাগতো..
আমার চেয়ে বয়সে বড় একজন আমায় সালাম দিচ্ছে।রাগ হত খুব।

খাবার দিয়ে এক মিনিট ও দাড়াতাম না।

সেদিন আমি আর আমার বান্ধবী জবা ছাদ এ বসে আড্ডা দিচ্ছি এর মাঝেই ইকবাল সাহেব ছাদ এ আসলো তার পাঞ্জাবী নিতে।

যেই আমাদের দেখছে সে তাড়াহুড়া করে ছাদ থেকে নেমে গেল।আমরা হো হো করে হেসে দিয়েছিলাম।
এরকম হাসার কাজ সে একটা -দুটা করেনায়।

আমরা ওনাকে ক্ষ্যাত ই বলতাম।আমাদের দেখলেই মাথা নিচু করে হেটে যেত। আমরা বাঘ-না ভাল্লুক কে জানে?

বাবা হঠাৎ বাসায় এসে বললো,ইকবাল কাল থেকে আমায় গনিত পড়াতে আসবে।
আমি বললাম সে তো চেহারার দিকেই তাকায়না।গনিত কিভাবে বুঝাবে?

বাবা বলে,গনিত বুঝাতে চেহারা দেখা লাগেনা।

খুব বিরক্তি লাগছিল।একজন অসামাজিক মানুষ এর কাছ থেকে কোন ধরনের জ্ঞান নেয়া আমার জন্য অপমানের ছিল।

তাকে শিক্ষক মানাটাও লজ্জার ছিল।সবচেয়ে বড় কথা এখন চাইলেই আমি তাকে নিয়ে ঠাট্টা করতে পারবোনা…

দুপুর হতেই আমি তার বাসায় গিয়ে নক করলাম।সেই আবার দরজা খুলছেনা।

কিছুক্ষনপর দরজা খুলে আবার সালাম…

আমি: আপনাকে কি বাবা পড়াতে বলেছে আমায়?

ইকবাল: জ্বি..

আমি: আসলে আমি পড়বোনা..

ইকবাল: আসলে চাচা আমায় বলেছে আজ সন্ধ্যায় যেতে..

আমি: চাচা দিয়ে কি হবে?আমি পড়বো সো আমার ইচ্ছের দাম অনেক।আমি এখন কলেজে উঠেছি বুঝলেন।এখন আমি হাতে খড়ির বাচ্চানা যে বাসায় মাস্টার রেখে ক-খ শিখবো।
আমি কলেজের স্যার এর কাছেই পড়বো।আপনি বাবাকে বলবেন আপনি পড়াতে পারবেন না।

ইকবাল: আমি চাচাকে মিথ্যে বলতে পারবোনা।

উফ! রেগে চলে আসলাম এর চেয়ে বাবাকে ম্যানেজ করাও সহজ।
ঘড়িতে ঠিক কাটায়-কাটায় ৭টা। ইকবাল চ্যার হাজির।ওনারে স্যার বলতেও ইচ্ছে করেনা।
এতো বলার পর ও লজ্জা নাই।চাচা পাইছে একজন।

মা বললো যাও পড়তে ইকবাল বসে আছে।

আজব,আমি চা খাব তারপর যাব। পড়াতে আসলে একটু অপেক্ষা করতে হয়।
শুনিয়ে শুনিয়ে ই বলেছি।

পড়ার রুম এ গিয়ে দেখি সে হাতে একখানা বই নিয়ে নিচে তাকিয়ে পড়ছেন।

নিশ্চই গাইড দেখছেন।গনিত এ পড়লেই কি সে পিথাগোরাস হয়ে গেল নাকি?

পাশে গিয়ে সালাম দিলাম।আজ আর উনি আমায় সালাম দিচ্ছেনা।
উনি সালাম এর উত্তর নিয়ে বই টা পাশে রাখলেন..
আমি বই টা আড় চোখে দেখছি আসলে ওটা কি গাইড কিনা।গাইড হলেই বাবাকে জানাবো সে চুরি করে গনিত দেখে দেখে করায়।

অনেক চেষ্টা করেও বইয়ের নাম দেখতে পারলাম না।
এর মাঝেই উনি বললেন,গনিত বইটা বের করেন।

আমি হা করে তাকিয়ে আছি,শিক্ষক হয়ে ছাত্রী কে আপনি করে বলে এ আবার কেমন শিক্ষক!
১টা ঘন্টা আমি কোন মতে বসেছি আর উনি চুপচাপ খাতায় গনিত করছেন।
মনে হয় ওনাকে আনা হয়েছে গনিত এর নোট লিখাতে..

কিচ্ছুক্ষন পর পর ই বলছে না বুঝলে বলবেন…
আমি তো কিছুই বুঝিনাই তাই আর বলিও নাই।ওনার কাজ গনিত করিয়ে উনি চলে গেলেন।

উনি যাবার পর ই দেখি টেবিল এ সেই গাইড রাখা।ভুলে রেখে গেছেন।
আমি তাড়াহুড়া করে খুলে দেখলাম ওটা আসলে “মক্বছুদুল মুমীন”

বই খুলেই দেখি লেখা “বেহেস্তের পথ”

আর সাথে এক মিষ্টি ঘ্রান..কোন সুগন্ধি আতরের।
যে খাতায় ইকবাল অংক করেছে সেই খাতা-কলম থেকেও সেই একই ঘ্রান।ঠিক যেন শেফালী ফুলের ঘ্রান…

তার মানে এই আতর খেঁজুর ই দিয়ে এসেছিল।
ইকবাল কে আমি তার পিছনে খেঁজুর বলেই ডাকতাম…

বই নিয়ে নিচের তলায় গেলাম।দরজা নক করলাম..
খেজুর আজ সাথে সাথেই দরজা খুলছে..

আবারো সে সালাম দিল।
কি অদ্ভুত সে ভুলেই যায় সে আমার শিক্ষক..

আমি: এই নিন আপনার বই..

ইকবাল: বই এর নাম দেখেছিলেন?

আমি: মানে?

ইকবাল: না কিছুনা…

তার মানে আমি যে আড় চোখে দেখেছি তা উনি খেয়াল করেছেন..

আমি: আচ্ছা আমি আসি..

আসলে যতটা হাদা ভাবি উনি তা নন।সব বুঝেও না বোঝার ভান করে।
আচ্ছা উনি আবার জঙ্গি নয় তো..

বাবা আসলে মানুষ না বুঝেই বাসা ভাড়া দেয়।এসব রহস্যজনক মানুষ খুব ভয়ানক হতেই পারে…

আমার মনে হয় উনি ঘরের মধ্যে বোমা বানায়।তাই দরজা খুলতে দেড়ি হয়..

বাসায় যাবার পর মা জিজ্ঞেস করলো কই গিয়েছিলি..

আমি: জঙ্গির বাসায়..

মা হা করে তাকিয়ে আছে।

আমি ফিসফিস করে বললাম মা আমার মনে হয় ইকবাল জঙ্গি..

মা ভীত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলছে কি বলিস?
তুই কি ওর হাতে বন্দুক-টন্দুক দেখছিস?

আমি: না তা দেখিনাই তবে চেষ্টা করলে দেখতে পারবো.তাছাড়া আমরা তার বাসার কাউকেই আসতে দেখিনি।

এর মাঝেই বাবা আসলো..

আমায় জিজ্ঞেস করতেছে,কি লুবনা পড়া কেমন লাগছে?

এর মাঝেই মা উঠে বললো,রাখো তোমার পড়া, তুমি দেখে শুনে লোক উঠাবানা বাসায়।

বাবা: কেন কি হয়েছে?

মা: ছেলেকে আমার সুবিধার মনে হয়না…

বাবা হাসি দিয়ে ভিতরের কক্ষে চলে গেল।

মা আমার পাশে এসে বলে তোর বাবা হাসে হাসুক,সে গুরুত্ব না দিলেও আমি ওই ছেলেরে বাসা থেকে বের করেই ছাড়বো..

আমি: কিভাবে?

মা: পানি দিবনা।ওর বাসার মেইনসুইচ অফ করে রাখবো..ও নিজেই বাসা ছেড়ে দিবে।

আমি: মা তাতে যদি সে আমাদের উপর রেগে বোমা মারে..

মায়ের মুখটা এমন ভাবে শুকিয়ে গেল মনে হচ্ছে আমরা ১৯৭১সালের যুদ্ধে অবস্থান করছি..
আর আমাদের আশে পাশে ইকবাল হল পাক হানাদার বাহিনীর সদস্য।

আমি হেসে বললাম মা এতো চিন্তার কিছু নাই।সে জঙ্গি হলেও তোমার কিছু করবেনা।তুমি যে মজার মজার খাবার দেও তাকে, তাতে সে কাউরে বাঁচিয়ে রাখলে তা হবা তুমি..

মা পাশের রুমে গেল আর বললো,জঙ্গিদের আবার মা-বাবা!

পরের দিন সে ঠিক সময়ে হাজির।

মা মাঝে মাঝেই আমাদের পড়ার কক্ষে ঘুরে যায়। আমি জানি মা এখনো ইকবাল কে সন্দেহ করছে।

ইকবাল যাতে বুঝতে না পারে তার জন্য মা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বাহানা নিয়ে আসে।এই যেমন লুবনা আমার ব্যাগ টা দেখছিস??

আর ইকবাল সেই নিজের মতন করিয়ে একের পর এক গনিত কষে যাচ্ছে।

পরের দিন মা বললো ইকবাল এর বাসায় খাবার নিয়ে যাবে।
আমাকে পড়াতে আসার পর আমি আর খাবার নিয়ে যাইনা।মা ই নিয়ে যায়…

মা বললো আজ তার সাথে আমাকে ও যেতে। আমরা বাহানা করে ঘরের ভিতর গিয়ে দেখবো আসলে বোমা আছে কিনা..
বা কোন প্রমান..

নিজেদের কেমন গোয়েন্দা -গোয়েন্দা লাগছে…

মা সামনে খিচুড়ি নিয়ে আর আমি পিছনে…

মা শিখিয়ে দিল যে সে ভিতরে যাবার সাথে সাথে আমাকেও যেতে।
মা ইকবাল এর সাথে কথা বলবে আর আমি এদিক -সেদিক প্রমান খুঁজবো।

মা এখানে ডিবির প্রধান আমি তার চামচা আরকি…

ইকবাল এর ঘরের সামনেই গিয়ে দেখি দরজা খোলা…
মা বললো: লুবনা বাসা রেখে পালালো নাকি?

আমি: মা হতেও পারে।আমরা সন্দেহ করেছি বুঝে গেছে।
আচ্ছা এটা আবার ফাঁদ নাতো..?

আমাদের খালি হাতে ভিতরে যাওয়া কি ঠিক হবে?

মা: খালি হাত কই?হাতে তো খিচুড়ি আছে।

আমি: উফ!হাতে ছুড়ি বা গুলি নিয়া আসিনাই তো..

মা: তা পাবো কই,ইস! বাসায় দা -বটি ছিল তো..

আস্তে আস্তে দুজন ভিতরে গেলাম।আমার জঙ্গির উপর ভরসার চেয়েও ভরসা ছিল ইকবাল এর উপর।সে ক্ষতি করার মতন না।
এই ভেবে আমি আগে ঢুকলাম..
গিয়ে দেখি বিছানায় কাথা গায়ে শুয়ে আছে।

এই অবেলায় শুয়ে আছে?
মা ঢাকলো কোন সাড়া নেই..

আমি : মা আত্মঘাতী হলো নাকি?

মা: চুপ থাকতো।সে গিয়ে ইকবাল এর পাশে বসে ডাকছে।

আমি এই ফাকে খাট এর নিচে, টেবিল এর উপর…আর আছে এক পুরাতন আলনা তাতে তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম।

চারদিকে খোঁজার পর দু একটা তেলাপোকার ডিম ছাড়া কিছুই জুটে নাই..
কিছুক্ষন পর দেখি মা ইকবাল এর মাথায় পট্টি দিচ্ছে।
আর বাবা বাবা করে সম্মোধন করছে।

কি হলো বুঝলাম না।এই লোক জাদু করতে জানে নাকি!

আমি: মা চলো যাই।

মা: তুই যা আমি পরে আসবো।

আমি: কি বলো?এখানে থাকা ঠিক হবেনা।

মা: তুই দেখছিসনা ছেলেটার জ্বর।
জ্বরের ঘোরে মাকে ডাকছে।

আমি: মাকে ডাকছে,তোমাকে তো না।

মা: তুই যা তো উপরে।আর গিয়ে তোর বাবাকে এখানে পাঠিয়ে দে।উনি এসে ডাক্তার আনলে আনবে।

ধূর!আমি মাকে ও হাতছাড়া করলাম।
ছেলে নেই বলে যে কোন ছেলেরেই নিজের সন্তান ভাবা ওনার অনেক আগের রোগ…

বাসায় গিয়ে বাবাকে পাঠিয়ে দিলাম।

সন্ধ্যা হলো,যেহেতু জ্বর তাহলে আজ আর পড়াতে আসবেনা।
তাই আমি কানে ইয়ারফোন গুঁজে গল্পের বই পড়তে বসলাম…

“রবীন্দ্রনাথ এর মহামায়া”

যে চেয়ারে ইকবাল বসে সে চেয়ারে পা রেখে টেবিল এর উপর বসে পড়ছি আর পা নাড়াচ্ছি।

এর মাঝেই ইকবাল হাজির..

আমি তড়িঘড়ি করে নামলাম।আমি নামার সাথে সাথেই উনি চেয়ারে বসলো..

আমি: আপনার না জ্বর?

ইকবাল: এখন একটু সুস্থ।

আমি মুখ বাকিয়ে পড়তে বসলাম।

এর মাঝে মা এসে কি যে বাবা-বাবা শুরু করে দিল..
আমার বাবার চেয়েও মা বেশি ফিদা হয়ে গেছে মনে হচ্ছে।

আমায় মা ডাক দিয়ে ভিতরে নিল, আমি গেলাম মা বলে, তুই পড় আমি ইকবাল এর জন্য সামনের দোকান থেকে কিছু খাবার নিয়ে আসি…

বেচারা এই জ্বরের মাঝে এসেছে.

আমি: মা এই জঙ্গির কাছে রেখে যাবা?

মা: যা পড়তে বস..

মা চলে গেল..
ইকবাল বার বার কাশি দিচ্ছে আর আমায় বহুপদী সমীকরন বুঝাচ্ছে।
তবুও বুঝানো থামাচ্ছেনা।

কিন্তু মা যাবার ১০মিনিট এর ভিতর ই বিদ্যুৎ চলে গেল….

আমি ছোট বেলা থেকেই খুব সাহসী মেয়ে।আমি অন্ধকার কে ভয় পাইনা।
জীবন কোন চলচিত্র নয় যে বিদ্যুৎ গেল আর আমি ভয়ে কাউলে জড়িয়ে ধরবো…
তা আবার খেজুরকে!

আমার ভয় ভুতে নয়,আমার ভয় মানুষে।

মায়ের উপর রাগ বেড়ে যাচ্ছে। আমাকে সে বাঘ এর মুখে ফেলে গেল।
ছেলে আর বাঘ এক ই।মা হয়ে পারলো কি করে।

ইকবাল ওর পকেট থেকে মোবাইল বের করে আলো জ্বালালো আর আমি তখন উঠে রান্না ঘরে গেলাম মোম খুঁজতে…

সব ঘর অন্ধকার।কবরের মতন লাগছে।আর ভয়ে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।

রান্নাঘরে তাকের উপর হাত দিতেই গরম তরকারীর কড়াই আমার গায়ে পরলো।আমার চিৎকার শুনে ইকবাল ফোন নিয়ে রান্নাঘরে আসলো।

আমি ওনাকে রান্নাঘরে দেখে পুড়ে যাওয়ার ব্যাথা ভুলে গেছি ভয়ে।

ইকবাল: আচ্ছা একটু দেখে শুনে কাজ করা যায়না?
আমার ফোনটা নিয়া আসতেন।

এই নেন এই আলোয় খুঁজুন এখন…

আমি আবার তাকের উপর খুঁজছি।হঠাৎ খেয়াল করলাম রান্না ঘরের দরজার পাশে অনেক লোকের জটলা…

একেক একেকজনের হাতে টর্চ।সবাই আমাদের দিকে মারছে…

এর মাঝেই আমার ফুপাতো ভাই রুবেল আসলো ইকবাল এর পাশে..

ইকবাল: কি হয়েছে ভাই?

রুবেল: আবার জিগাছ কি হইছে?
এখানে বসে নষ্টি ফষ্টি করছ আর জিগাস কি হইছে এই বলেই ইকবাল এর হাত ধরে সামনের রুমে নিয়ে গেল…

আমি: ভাইয়া কি বলো এসব…

রুবেও: ওই তুই চুপ কর।তুই যদি আমার আপন বইন হইছি আমি তোরে আজ খুন করতাম।
মামা আসুক আজ,কি করা লাগে করুম…

যেই মানুষের ভয়টা আমি পেয়েছিলাম ঠিক সেটাই হলো…

আমার ইচ্ছে করছে যদি গায়েফ হয়ে যেতে পারতাম।এই লজ্জা নিয়ে মানুষ কি করে বাঁচতে পারে…

মনে মনে দোয়া কালাম পড়ছি আর কাঁদছি…

আশে-পাশের সব প্রতিবেশী আমাদের বাসায় হাজির।

কেউ বলছে মাইয়াটারে ভালো ভাবছিলাম।এগুলার মধ্যে এতো..

সবাই যে যার মতো ঘটনা বানাচ্ছে।আর আমার দিকে বাজে ইঙ্গিতে তাকাচ্ছে।

১০টা খুন করলেও তাকে যেভাবে ধরে না রাখে, ইকবাল কে তার চেয়েও খারাপভাবে দুপাশ থেকে দুজন ধরে রাখছে।
এতো মানুষ এর ভীড় কাটিয়ে পিঁপড়াও পালাতে পারেনা তারপর তো মানুষ।

অনেকের কথা শুনে বুঝলাম,আমার ফুপাতো ভাই ই সবাইকে ডেকে এনেছে।

আজ আমার বড় ভাই নেই বলে যে কেউ আমার উপর জুলুম চালাতে পারছে…

পাশের বাসার কাকি বলছে আমায়,ওই মাইয়া তোমার মা কই?

যে মহিলা কিনা দু দিন আগেও আমায় মা সম্বোধন করতো সে আজ আমার সাথে এমন করে কথা বলছে..

আমি কোন জবাব দিলাম না…

এর মাঝেই পাশের একজন বললো আরেহ মহিলা মনে হয় মাইয়া দিয়া ব্যবসা করে।
ঠিক মাইয়ারে ছেলের কাছে রেখে ঘর ফাঁকা করে গেছে..

কথাগুলি আমার শরীরে পেরেক বিঁধে দেয়…

পাশের বাসার কাকা: এই এলাকা ভদ্র এলাকা..এখানে এসব চলবেনা।আমাদের ও মেয়ে বউ আছে ঘরে..মানসম্মানের বেপার…

মনে মনে ভাবি আমি কি এমন পাপ করেছিলাম যার শাস্তি আল্লাহ আমায় এতো অপমান দিল।কত মানুষ খারাপ কাজ করে মাথা উঁচু করে ঘুরে বেড়ায় আর আমার দোষ রান্নাঘরে মোম খোঁজা?

একজন বলছে,এই সবার ঘরে বিদ্যুৎ আছে এ ঘরে নাই কেন?

এর মাঝেই আমার ফুপাতো ভাই বলে আরে বুঝেন না,এই বেটা হুজুর মনে হয় আসার সময়ে নিচের মেইনসুইচ বন্ধ করে এসেছে…

সে এই বলেই নিচে গিয়ে মেইন সুইচ অন করলো….

বাবা সুবিধার জন্য নিচে সব বাসার আলাদা আলাদা মেইনসুইচ রেখেছে আর তা বাক্স দিয়ে তালা মারা থাকে।তালা কি করে খুললো!

আমার বুঝতে বাকি নেই এই রুবেল ই মেইন সুইচ অফ করেছে…

আমার ফুপুর সাথে বাবার জমি নিয়ে বিরোধ ছিল বহুদিন।তাই বলে সেই প্রতিশোধ এভাবে নিবে!

এর মাঝেই মা আসলো…

অনেক মানুষ বাসায় দেখে মায়ের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।আমি মাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম।
অনেকক্ষন পর আমার ভয় কিছুটা কমলো।

মা: কি হয়েছে এখানে?এই লুবনা কাঁদছিস কেন?

রুবেল: মামি কই গেছিলেন..

মা: দোকানে,কেন?

পাশের বাসার আন্টি: এমন ই প্রতিদিন যান?

মা: মানে?

রুবেল: মামি এটা একটা ভদ্র এলাকা।আপনার মাইয়ার জন্য কি এলাকাছাড়া হমু?
আমার এক বন্ধু থাকে আপনাদের উপর তলায়..
সে আমায় কল দিয়ে জানালো এ ঘরে খারাপ কাজ চলে।

আমার মামাতো তো বোন বলে ওরা কিছু বলেনায়…
না হলে তো রাস্তায় নামাতো.

মা চুপ করে আছে,মনে হয় তার বলার কিছু নাই।মা হলেও মেয়ে তো অতিরিক্ত সাহস কলিজায় সঞ্চয় নেই।

অন্ধকারে ইকবাল কে দেখিনি।
এখন বিদ্যুৎ এর আলোয় দেখতে পারছি।
মাথা নিচু করে আছে।মনে হচ্ছে ফাঁসির আসামী।

আপাদত নিজেকে ছাড়া কারো প্রতি সহানুভূতি দেখাতে পারছিনা।

রুবেল ইকবালকে ধাক্কা দিয়ে বলছে,ওই বেটা তোর বাড়ি কই।

ইকবাল কিছু বলছেনা।

রুবেল: যাক তুই কবি না আমি কমু?কি করছস তোরা?

ইকবাল আমার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে কাকি…

এর মাঝেই রুবেল তাকে ধাক্কা দিয়ে বলে একটাও কথা কবিনা তুই থাম।
লজ্জা নাই তোর?

শুনেন মামি,আমি আপনাদের সম্মান করি কিন্তু এখন যা ঘটছে তা মান ইজ্জত এর প্রশ্ন।
যদি শাস্তি না দেয়া হয় তাইলে বাকি সবাই প্রশ্রয় পেয়ে যাবে।

মা: আচ্ছা তোমরা কি দেখছো তা তো বলবা…
মা যে ভয় পেয়েছে তা তার কাপাকাপা কণ্ঠে স্পষ্ট।

রুবেল: আরেহ আমি কি জানি পাশের বাসার আন্টি ওদের খারাপ অবস্থায় ধরছে।
আমি না থাকলে তো ওই বেটারে গন ধোলাই দিয়ে মেরে ফেলত।

রুবেল কে আমার হায়নার মতন ই হিংস্র লাগছে।যে ছেলে এলাকার সব মেয়েকে উতক্ত করে সেই কিনা আজ বিচারক!
এই না হল সমাজ…

কেউ আমার মানসম্মান এর কথা ভাবছেনা সবাই গুনডার কথা বিশ্বাস করে।
আগে জানতাম আপনজন নাকি আপনজনের ক্ষতি করতে ঘরে চোর পাঠায় কিন্তু আমার ঘর যে দিন দুপুরে ডাকাতি হয়ে গেল।

রুবেল: এখন কন আপনে শাস্তি দিবেন না আমি দিমু?

মা বলে কারে শাস্তি দিবা?
আমার জামাইরে?
আমার মেয়ে আর মেয়ের জামাই কি অবস্থায় থাকবে তা তোমাদের দেখার বিষয় না।

তোমরা আমার ঘরে এসে জুলুম শুরু করছো আমি পুলিশ এর কাছে যাব..

আমি আর ইকবাল দুজন ই মায়ের দিকে তাকালাম।
ভাবছি মা এসব কি বলছে।জামাই কই দিয়া আসলো।

আপাদত মাথায় কাজ করছেনা।মনে হচ্ছে আমি এক যুগ জেল খেটেছি।ক্লান্ত খুব….

রুবেল: জামাই?

মা: হুম ইকবাল এর সাথে আমার মেয়ের কাবিন হয়ে গেছে দু মাস হলো।

রুবেল: সেটা কেউ জানলোনা?

মা: আমার মেয়ের বিয়ে আমি কারে জানাবো তা তোমায় জিজ্ঞেস করবোনা…

রুবেল: আচ্ছা আমরা আর বিপদে পরলে আসবো না।চলেন আপনারা যাই এখন।

সবাই চলে যাচ্ছে আর বলছে এই ছেলের কথায় আসাই উচিৎ হয়নি।

অনেকে আবার বলছে নাটক দেখলাম ফ্রীতে…

পাশের বাসার আন্টি বলছে ভাবি বিয়া কিন্তু খাওয়া চাই।আবার না বলে উঠিয়ে দিয়েন না।
বাবা!আমরা জানতেই পারলাম না।

সবাই চলে গেছে।ইকবাল আমি আর মা দাড়িয়ে আছি।

এসব কি হচ্ছে সব ই স্বপ্ন লাগছে।

মা: লুবনা ওরা ঘরে ঢুকলো কি করে?

আমি: তুমি যে গেলে দরজা আমি আর লাগাইনি।
আচ্ছা এসব কি বললা তুমি জামাই এর কথা?

ইকবাল: কাকি আমি কাল ই বাসা ছেড়ে চলে যাব। আমাকে আর এই এলাকায় দেখবেন না।

এই ভীতুকে কিনা ভাবছি আমি জঙ্গি।এতো অপমানের চেয়ে ইকবাল আমায় খুন করলে খারাপ হতনা।

মা: এখন তো যাবেই।আমার মেয়ের সর্বনাশ যা হবার তা তো হয়েই গেল বলে মা কেঁদে কেঁদে বসে পড়লো।

আমি: মা উনি কিছু করেনি।আমরা মোম…

মা: চুপ থাক তুই।তুই তোর বাবার মাথা নিচু করে দিলি।তোর বাবা জানলে মরে যাবে।একবার ও ভাবলিনা তুই আমাদের কথা..

আমি: তারমানে তুমি রুবেল এর কথা ই বিশ্বাস করেছো?

মা: শুধু কি রুবেল?
সবাই কি মিথ্যে বলে?
কিছু তো ঘটেছেই…

আমি এতক্ষণ ভয় পেয়েছিলাম,লজ্জা পেয়েছিলাম বাইরের মানুষের কথায়।
তবে এখন চরম আঘাত টা পেলাম।
নিজের মা ই যদি ভুল বোঝে তার চেয়ে অভাগী আর কে আছে।

ইকাবাল মাকে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেনা বা কিছু বলার নাই।
ও বাসা থেকে বের হয়ে গেল…

বাবা আসেনি এখনো। আসলে কিভাবে তার চোখে চোখ রাখবো..
আজ আমি সামান্য কিছু ভুল করলেও নিজেকে সান্তনা দিতে পারতাম।

কিন্তু আজ কিছু না করেও সর্বোচ্চ শাস্তি পাচ্ছি।
শেষে কিনা আমার মা আমায় খারাপ ভাবলো..

ভাবছি মরে যাব। জাহান্নামের আগুন ও আমার অপমান এর আগুন কে ছাড়াতে পারবেনা।

আমি মরে গেলে আমার মা বাবা কে ঠিক ই সমাজ বলবে মেয়ে খারাপ তাই মারা গেছে।
আমি তাদের এসব এর মাঝে রেখেও যেতে পারছিনা।

কিছুক্ষন পর মা আসলো আমার রুম এ।
-লুবনা চল..

আমি: কই?

চল তুই….

আমার হাত ধরে নিচে ইকবাল এর বাসায় নিয়ে গেল..

ইকবালের জ্বর টা মনে হয় বেড়েছে। চোখ লাল রক্তের মতন।
কিছুটা অপমানেও বেড়েছে।
সে মাকে দেখে মাথা নিচু করে আছে।

মা ওর হাত ধরে বলছে,বাবা আমার মেয়েকে তুমি বাঁচাও বাবা।

ইকবাল: কাকি কি করছেন…বসেন শান্ত হয়ে।আসলে আপনি যা ভাবছেন তা কিছুনা।

মা: বাবা ঘটনা আর ভাবার পর্যায়ে নেই।

আমি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাড়িয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম।আমার ইচ্ছে করেনা আর প্রতিবাদ করতে।

মুখ দিয়ে সব শব্দ ই বিলীন হয়ে গেছে।এখন কেউ মেরে ফেললেও কাঁদতে পারবো না আমি।
অসাড় হয়ে গেছি।

ইকবাল: কাকি আমি কি করবো বলেন?
এখন ই বাসা ছেড়ে যাব?

মা: না বাবা..দেখো আমার মেয়ে ভালো থাকুক তা ওর ফুপু বা ফুপাতো ভাই চায়না।
আমার মেয়ের কপালে যা জুটল এতে ওর বিয়ে দিতে পারবো না আর।
এখন আমি বলে ফেলেছি তুমি ওর স্বামী পরে এটা জানাজানি হলে আমায় এলাকা ছাড়া করবে।নিজেদের বাড়ি ছেড়ে কই যাব বাবা?

মায়ের মুখ দেখে কি অসহায় লাগছে।আমায় নিয়ে মা কি বিপাকেই না পরে গেছে..
এর চেয়ে মেরে ফেললেই তো সব ঝামেলা শেষ…

ইকবাল: কাকি আমি কি করলে আপনি খুশি হন বলেন..
আমি রুবেল এর কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবো? আপনি বললে চাইবো…

মা: না বাবা,তুমি লুবনা কে বিয়ে করো তাহলে সব ঝামেলা শেষ…

আমি: মা…

মা আমার দিকে তাকালইনা..

ইকবাল: কাকি আমার বাবা অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করান।
আমি ই বাসার বড় ছেলে বাবা জানলে মরে যাবে।

মা: আমি তাদের বলবো.

ইকবাল: তাছাড়া লুবনাকে বিয়ে করার আমার যোগ্যতা নেই।
আর ওর ও একটা মতামত আছে।

মা: ও কি বলবে..মানসম্মান আগে।
ইকবাল আমার দিকে তাকালো..

এই সেই ছেলেকে আমি তাচ্ছিল্য করতাম আজ তার কাছে আমাকে বিয়ে করার জন্য আকুতি জানাচ্ছে আমার ই মা..

মাঝে মাঝে বাস্তব খুব কঠিন হয়ে যায় যা সিনেমাকেও হার মানায়।

হায়রে সমাজ!তুমি সব পারো…

আমি কোন প্রতিবাদ করছিনা।আমার কপালের উপর সব ছেড়ে দিছি।
একমাত্র মেয়ে আমি,কি হত আমায় সারাজীবন অবিবাহিত রাখলে!
নাকি জন্ম মানেই বিয়ে করতে হয়!

একটা সময় আমার মত ছাড়াই আমার বিয়ের কার্যক্রম শুরু হয়।এর মাঝে ইকবাল অনেকবার আমার সাথে কথা বলতে চাইলেও আমি বলিনি।ইচ্ছে করেই বলিনি।

ইকবাল ওদের বাসার মানুষকে কি জানিয়েছে তা আমি জানিনা তবে যতদূর জানি তারা মেনে নেয়নি।
না মানার ই কথা…

১৬ই জুলাই,শুক্রবার আমার বিয়ের দিন ধার্য করা হয়।
একদম ঘরোয়া ভাবে আমার বিয়ের অনুষ্ঠান হয়।

এমন টা আমার প্রত্যাশায় ছিলনা।অনেক আগ থেকেই বিয়ে নিয়ে পুষে রেখেছিলাম অনেক কিছু।

দিনটা আমার কাছে এমন ভাবে ফিরে আসবে তা আমি কল্পনাও করিনি।

শুনলাম ইকবাল এর বাড়ি থেকে কেউ আসেনি।
ইকবাল এর কয়েকজন বন্ধু আমার বাবা মিলে মসজিদ এ গেল।

আমি অপেক্ষা করছি আমার বিয়ের।কি অদ্ভুত তাইনা।

সবাই মিষ্টি নিয়ে এসে বললো বিয়ে হয়ে গেছে।

কল্পনা গুলি এমন ছিলনা আমার।লাল শাড়ি পরে কবুল বলার স্বপ্ন ছিল বহু আগের ইচ্ছে..

কিন্তু বাস্তবে কবুল বলাও দরকার নেই মেয়েদের।
আচ্ছা কবুল বললেও কি মন থেকে বিয়ে করা হয়!
মনের অনিচ্ছা থাকলে সে বিয়ে কি করে বৈদ্ধ হয় আর সেই বিয়েকে কেন্দ্র করে কি করে দিনের পর দিন এক ছাদ এর নিচে থাকে?

তখন তো কোন রুবেল বিচার করতে আসেনা।
আসলে রুবেল এর মতন ছেলেরা পারে কেবল ভালো কে খারাপ করে দেখতে। তাদের সাহস নেই প্রতিবাদ করার…

যে মানুষগুলি কয়েকদিন আগে রাতে তিরস্কার করেছে তারা আজ আমাদের বিবাহিত জীবনের মঙ্গল কামনা করছেন।

মানুষখুব তাড়াতাড়ি রূপ বদলাতে পারে।

আমি সেদিনের পর থেকে কারো সাথেই কথা বলিনা..
এক ধাক্কায় অনেকটা সাবলীল লাগছে নিজেকে।

রাতে ইকবাল আর ওর বন্ধুরা আমাদের বাসায় রইলো।
ইকবাল কে আমার রুম এ শুতে দিল মা।

মাকে অনেক খুশি দেখাচ্ছে।খুশি হবার কারন আমি বুঝতে পারছিনা।
আর বাকিদের মতন আমার বাসর ঘর ফুলে সাজানো হয়নি..

শুধু নতুন বিছানার চাদর দেয়া হয়েছে।
বাসর দিয়ে অবশ্য কি বা হবে,বাসর ঘরে যার সাথে চলার শুরুর সাক্ষী, সেই চলার সাথী ই তো আমার অপছন্দের।

আমি বাকি নতুন বউয়ের মতন বিছানার এক কোনে লজ্জা মুখ নিয়ে বসে রইলাম না।জানালার পাশে দাড়িয়ে আকাশ দেখছি…

এমন সময়ে মা আসলো আমাদের কক্ষে..

ইকবাল বসা থেকে উঠে দাড়ালো..
মনে হয় ক্লাস রুমে এ শিক্ষক এসেছে আর ইকবাল ছাত্র..

মা: ইকবাল ব্যস্ততায় তোমার সাথে কথা বলা হয়নি..

ইকবাল: জ্বি কাকি বলুন।

মা হেসে বলে এই ছেলে এখনো কাকি কি?

ইকবাল চুপ করে আছে।

মা: ইকবাল লুবনা আমাদের একমাত্র মেয়ে।আমরা ওর কোন আবদার অপূর্ন রাখিনি।
এই যে বাড়ি তা তো ওর ই আর সেই সুবাদেই তোমার..

আমি আর ওর বাবা চাই আমাদের মেয়ে আরো কয়েকবছর এখানে থাক।কি ই বা বয়স ওর! পড়াশোনা শেষ করে শ্বশুর বাড়ি যাক। আর তোমার মা বাবা ও তো কেউ আসলেন না তাদের কাছে কি করে মেয়েকে পাঠাই।
তুমিও থাক এখানে। তারপর সুযোগ-সুবিধা বুঝে যাবা।
দুজন ই পড়াশোনা টা করো ভালোকরে।

ইকবাল: কাকি…ও মা, আসলে আমার কাল একটু বাড়ি যেতেই হবে..
বাবা রাগ করে আছে আমার উপর।আমার যেতেই হবে।

মা: আচ্ছা তুমি যাও। কিন্তু লুবনা থাক…

এই বলে মা আমার কাছে এসে আমার মাথায় হাত রেখে বলছে ঘুমিয়ে পর।

মা চলে যাবার পর ইকবাল আবার বসে বসে ঝিমাচ্ছে।
আচ্ছা উনি কি পালাবে?
পালানোর ই কথা..
উনি পরেছে মহা অশান্তিতে।

আমি ইকবাল এর পাশে গিয়ে বললাম,আমাকে নিবেন আপনাদের বাড়ি?

ইকবাল হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

আমি: কি নিবেন না?আমি শ্বশুর বাড়ি আমি যাবনা?

ইকাবাল আমার এ আচরনে ভয় পেয়েছে হয়তো…

যদি নিজের বাসায় থাকার জন্য বিয়ের ষ্ট্যাম্প লাগিয়ে থাকতে হয় তাহলে শ্বশুরঘরে যাওয়াই ভালো..

আমি ইকবাল এর হাত ধরে ওর পায়ের কাছে বসে কেঁদে দিলাম,প্লিস আমাকে নিয়ে যান।

আমার রাগ ছিল আমার উপর,আমার রাগ ছিল আমার মায়ের উপর।এখন আমার উপর ইকবাল এর অধিকার সবার আগে তাই মাকে আমি আর জয়ী হতে দিচ্ছিনা।

ইকবাল আমার হাত ধরে উঠিয়ে বলছে,কি করছো লুবনা…কাঁদছো কেন?

বিয়ে যেহেতু করেছি নিব তো অবশ্যই তবে তুমি এখানেই ভালো থাকবে।

আমি: না আমার এখানে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।আমি এ ঘর থেকে বের হতে চাই।

ইকবাল: আচ্ছা যাবে।

ইকবাল কিছুক্ষন পর বন্ধুদের সাথে ঘুমাতে গেল।

আর আমি সারারাত বসে-দাড়িয়ে কাটিয়ে দিলাম।কি যেন হারয়েছে আমার আর তার ই হিসাব মেলাচ্ছি।

আযান দিতেই ইকবাল আমার বাবা আর ওর বন্ধুদের নিয়ে গেল নামাজ পড়তে আর যাবার সময় আমাকেও বললো পারলে যেন নামাজটা পরে নেই।

সকাল ৭টা, আমি ব্যাগ গুছিয়ে বসে আছি।
মা নাস্তা দিতে এসে দেখে ব্যাগ..

মা: কিরে লুবনা ব্যাগ কিসের..?

আমি: আমার।

মা: কেন?

আমি: ইকবালের সাথে তাদের বাড়ি যাব। মা কি বলি শুনছো বলে কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে ডাকতে গেল।

বাবা বেচারা আজকাল আমার কাছে আসেইনা
হয়তো আমার দিকে তাকাতে লজ্জা পায় নয়তো কষ্ট হয়।

বাবা আসলো আমার কাছে…
আমার পাশে বসে কাঁন্না গলায় বলছে,কিরে মা পাগলামি করছিস কেন?

আমি বাবাকে জড়িয়ে কাঁন্না করে দিলাম।বাবাও আর নিজেকে সামলাতে পারলো না।
এই তো সেদিন বাবার পেটের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরেছি আর আজ বাবাকে কাছেও পাইনা আমি।

আমি: বাবা আমি আবার আসবো..
আমার মনে হয় ইকবাল পালাবে..

যদিওবা এটা মিথ্যে সান্তনার জন্য বলেছি যাতে আমাকে যেতে দেয়।
ইকবাল যে পালানোর নয় তা আমি বুঝে গেছি।

পরে মা-বাবা রাজি হলো..
আমি এবং ইকবাল দুজন ই যাত্রা শুরু করলাম।

বাস এ বসে ইকবাল আমায় বলছে: তুমি ভেবেছো আমি পালিয়ে যাব?

আমি অবাক হয়ে ওনার দিকে তাকালাম..

তারমানে আমি বাবাকে যখন বলেছি, তখন সে শুনেছে..

আমি আর উত্তর দিলাম না,কিছু প্রশ্নের উত্তর জানা থাকেনা বা জানলেও বলার ইচ্ছে হয়না….

যাকে আমি আমার কেউ ভাবিনা তার ভুল ভাঙানোর আমার কিসের দায়..!

বাস এ যেতে প্রায় ৩ঘন্টা লাগলো..
বাস থেকে নেমেই এক গ্রাম..

শুধু গ্রাম বললে ভুল হবে, এটাকে ছোট গ্রাম বলা চলে..

নিজের ভাগ্যের কথা ভাবলেও হাসি আসে।

ইকবাল: এই যে রাস্তা দেখছেন এখান দিয়ে হেটে গেলে ২০মিনিট পর ই আমাদের বাড়ি।

আমি : হাঁটবো কেন?গাড়ি নাই?

ইকবাল: হা হা হা

আমি: হাসেন কেন?

ইকবাল: রাস্তা ভালোভাবে দেখেন,এখান দিয়ে গরুও হাঁটতে পারেনা তারপর তো গাড়ি..

আমি: তার মানে আমরা গরুর চেয়েও অধম?

হুট করে মনে পরে গেল আমার সাথে ঘটে যাওয়া দিনগুলির কথা..

দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললাম,হুম অধম ই তো…

দুজন ভুতের মতন চুপ চাপ হাঁটছি.
মাঝে মাঝে আমি জিরিয়ে নিচ্ছি।

এমন সময় ই ইকবাল বললো এই আমাদের বাড়ির দরজা।

আমি: কই দরজা?এটা তো রাস্তা।

ইকবাল: আরে এখানকার বাড়ি গুলি ওমন ই।
বাড়ির ভিতরে যাবার পথকেই দরজা বলে।একটু ভিতরে গিয়েই আমাদের আর-চাচার বাসা।

আমি: ও..তাহলে জানালা?

ইকবাল এর সাথে ধীরে ধীরে সংকোচ কমে যাচ্ছে।আমার মনে হয় ইকবাল এর ও।তাই ঠাট্টাতামাসা হচ্ছে।

বাড়ির ভিতরে যেতে বিশাল উঠান।
আর উঠান এর ৩পাশে ৩টা বাড়ি…

সব বাড়িগুলি কেমন এক ধাঁচ এ বানানো। চৌচালা…
আর সব ই নড়বড়ে। মনে হয় বাতাস আসলেই পরে যাবে..

আমি: আচ্ছা বাড়িগুলি কি এক ইঞ্জিনিয়ার এর প্লান করা?

ইকাবাল হেসে বলে এগুলো আমার দাদার আমলের।

এর ই মাঝে ইকবাল কে দেখে এক মহিলা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে কাঁন্না শুরু করলো..

এমন কাঁন্না তো মানুষ মারা গেলেও করেনা..
মহিলা আসলে কে, বুঝে উঠতে পারছিনা।

ইকবাল: লুবনা এ আমার মা…

আমি সালাম দিলাম,সে আমায় দেখে হয়তো খুশি হয়নি।
কোথায় তার বোকা ছেলের জন্য আমার মতন মেয়ে পেয়ে খুশি হবে তা না।

ঘরের ভিতর গেলাম।আমার কপালে বুঝি এ রকম স্বামীর ঘর লেখা ছিল…

ইকবাল আমায় তার কক্ষে বসিয়ে কই গেল কোন খোঁজ নাই।
এ ঘরে কেউ আমার আপন নাই।
চেনার মাঝে ওই একজন ই।

বাসার আর কাউকে দেখছিনা…

ক্লান্ত লাগছে খুব..
তাই বিছানায় শুয়ে পরলাম..
কত রাত ঘুমাইনা আমি..

ভাবতে ভাবতে চোখটা লেগে গেল,

কিছুক্ষন পর ই মানুষ এর গুনগুন শব্দে ঘুম ভাঙল..
তাকিয়ে দেখি বিছানার চার পাশে নানা বয়সের মহিলা ভীড় করে দাড়িয়ে আছে…
আমি তড়িঘড়ি হয়ে উঠে বসলাম।
ঘুমের ঘোরে ভুলে যাচ্ছি আমি আসলে কোথায়..
সবার দিকে একে একে তাকালাম..
পরে মনে হল এটা ইকবাল এর বাসা..

আমায় সবাই এমন করে দেখছে কেন..!
আমার কি আবার বিচার হবে কোন!!

আমি: কি করেছি আমি?

এর মাঝেই এক মহিলা হাসতে হাসতে বলে,উমহ্ এখন ভাজা মাছ উল্টাতে জানে না যেন…

আমার আবার ভয় করছে খুব।হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
চারপাশে তাকিয়ে দেখি ইকবাল কোথাও নেই।
আচ্ছা এরা পাচারকারী নাতো..

আরেকজন মেয়ে উঠে বলে,আমার দেবর টার মাথা চিবিয়ে গেয়ে এখন কিছু বোঝেনা।

আমি আরো চিন্তায় পরে গেলাম।
ইকবাল মারা গেছে নাকি..
কে ওর মাথা চিবিয়েছে!
আর তার জন্য আমাকে দায়ী করছে কেন!
আমি কি করে মাথা চিবাবো! আমায় দেখতে কি মানুষ খেঁকো মনে হয়…

এর মাঝে ইকবাল এর মা আসলেন।সবাইকে সরিয়ে বলছেন,সবাই একে একে বউকে মধু খাইয়ে দেও।

এতো মানুষ এর হাতে মধু আনুমানিক ৩কেজি খাওয়া হলো…

একজন আমার কানের কাছে এসে বলছে,এই ভাবি ভাইয়া তোমায় অনেক ভালোবাসে তাইনা??

কথাটা ফিসফিস করে বললেও পাশের মহিলারা হো হো করে হেসে বলে,ভালো না বাসলে কি করে বিয়ে করে আনে।

ভালোই মজে গেছে…
একেবারে তর সইছিলনা..বিয়ে করে হাজির..

আমি এদের কথার মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝছিনা..

এর মাঝে ইকবাল এসে বলে এ বাবা রুমে এতো ভীড় কেন?

এক মহিলা উঠে বলে এই চলো আমরা বের হয়ে যাই সাহেবের বউ কে একা লাগবে..

আমার মেজাজ খারাপ হচ্ছে কিন্তু কিছুই বলতে পারছিনা।
যদি এই আশ্রয় ও যায় এর ভয়ে…

সবাই আমায় হাত ধরে খাট থেকে নামালো..

যেই মেয়েটা আমার কানের কাছে এসে কথা বলছিল সে বলে,শোন ভাইয়া আজ তোদের গায়ে হলুদ..
ভীড় তো হবেই।

ইকবাল: আমাদের হলুদ হয়ে গেছে।এসব কয়বার করে?
যা এখান থেকে…

কথায় বুঝলাম মেয়েটা ইকবাল এর বোন…
সবাই ইকবাল কে রুম থেকে বের করে দিল।
আমাকে হলুদ শাড়ি -ফুল এসব দিয়ে সাজানো হলো..
এতো অল্প সময় এতকিছু কিকরে করলো!

উঠান এ সবাই কি আনন্দ..আর হৈ চৈ…

একে আরেকজনের গায়ে কাদা মাখাচ্ছে।এমন অনুষ্ঠান আমি দেখিনি আগে…

আমি দেখছি আর হাসছি..

এর মাঝে ইকবাল এর মা আমার পাশে এসে আমায় খোঁচা দিয়ে বলে,নতুন বউকে হাসতে নেই।মানুষ খারাপ বলে..

ভাবছি,এমন নিয়ম আমি কখনো শুনিনি।যার গায়ে হলুদ সে হাসবেনা আর তার গায়ে হলুদ নিয়ে সবাই মজা করবে..

শাশুড়ি হইছে..সব কিছুতে দোষ..
মানি না আমি বর তারপর তো শাশুড়ি..

অনুষ্ঠান শেষে ইকবাল এর বোন আমায় খাইয়ে দিল।
মেয়েটা খুব মিশুক।আমার চেয়ে ২-৩বছরে ছোট হবে।

সবাইকে দেখলাম কিন্তু ইকবাল এর বাবাকে দেখলাম না..

আমাকে বউয়ের মতন সাজানো হলো…
মনে হচ্ছে আমি বানর খেলা দেখাবো আর সবাই মিলে বানরকে সাজিয়ে দিল..

ইকবাল এর রুম এ ফুল আর বিভিন্ন লাল-নীল ফিতা টানিয়ে সাজিয়েছে।

এমন কেউ বাসরঘর সাজায়!

আমায় বসিয়ে যে যার মত হাসি তামাশা করছে…

কেন যে আসলাম আমি!আসা উচিৎ হয়নি।

খুব ঘুম পেয়েছে আর কেউ রুম থেকে যাচ্ছেনা..

একে একে সবাই চলে গেল কিন্তু ইকবাল কে দেখছিনা।
আমি কই ঘুমাবো তা ও বলে গেলনা..

মনে মনে গালি দিতে লাগলাম..এর মাঝেই শুনি কাঁন্নাকাটির শব্দ..

আমি বিছানা থেকে নামলাম তড়িঘড়ি করে।পাশের রুম এ গিয়ে দেখি ইকবাল এক লোক এর পা ধরে কাঁদছে…

আর পাশে ওর মা আর বোন ও কাঁদছে…

অনেকক্ষন পর বুঝলাম এটা ইকবাল এর বাবা।ইকবাল ক্ষমা চাচ্ছে।

ইকবাল এর বাবা বলছে, বাবা আমি তো তোমারে পড়া লেখা করতে পাঠিয়েছিলাম।
ভালোবাসলা তাই বলে বিয়ে পরে করা যেত না?

ভাবছি ভালোবাসা কই দিয়ে আসলো…

আর ইকবাল কাঁদছে ভালো কথা কিন্তু ওর মা কাঁদছে কেন?

কি যে নাটক চলছে বুঝছিনা..

আমায় দেখেই আবার ওর মা বলে হায় হায় তুমি এখানে আসছো কেন?

ইকবাল এর বাবা বলে থাক..এদিকে আসো মা..
আমি তার কাছে গেলাম..
ইকবাল এর মা আমার পাশে এসে বলে সালাম করো..

ইকবাল এর বাবা বললো,দেখো মা যা ভুল হবার হয়েছে।
বিয়ে আল্লাহর হুকুম ছাড়া হয়না।
আল্লাহর নাম নিয়ে ভালোভাবে সংসার করো…

আমি মনে মনে ভাবছি বৈধ বিয়ে হলেনা আমি সংসারের কথা ভাববো..
যাক কয়েকদিন..আমি নিজের পায়ে দাড়াই একবার, কারো সাথে যোগাযোগ রাখবোনা…

আমি শুধু মাথা নাড়ালাম।

রুমে আমায় আর ইকবাল কে রেখে ওর বোন ইতি বাইরে থেকে দরজা দিয়ে গেলো..

আমি: আপনার বোন কি সারাদিন বাংলা সিনেমা দেখে?

ইকবাল: কেন?

আমি: ওর মাঝে অনেক ফিল্মি বেপার আছে।

ইকবাল: আমাদের বাসায় টেলিভিশন নেই..
বন্ধুদের বাসায় দেখতে পারে..

আমি : টেলিভিশন নাই?
কিভাবে থাকেন আপনারা?

ইকবাল হাসছে…

আমি: হাসবেন পরে,এখন বলেন ওয়াশরুম কই?আমি শাড়ি পরে থাকতে পারিনা।এই শাড়ি আমার ওজনের ৩গুন।

ইকবাল: ঘরের ভিতরে ওয়াশ রুম নাই।পুকুর ঘাট এই আমরা গোসল করি.

আমি: কি?
এখন আমি কি করবো…?

ইকবাল: দাড়ান আমি ইতিকে ডাকছি।দরজা খুললে আমি চলে যাব।

ইতিকে ডাকছে,কোন সাড়া নেই।

ভালোলাগছেনা,এর মাঝে আমার ঘুম পেয়েছে খুব।

আমি: আচ্ছা আমি কি বিছানায় ঘুমাবো?

ইকবাল: হুম ঘুমান।

আমি: আপনি?

ইকবাল: আমি পড়বো..
কিছুদিন পর আমার পরীক্ষা।

আমি: সারাদিন এতো ধকল আর এখন পড়বেন?
শুনুন আপনি আবার সিনেমার নায়কের মতন নিচে শুয়ে পরবেন না।
বিছানায় ই ঘুমান সমস্যা নাই।আর আলো জ্বলুক..
আমি রাতে আলো ছাড়া ঘুমাতে পারিনা…

আমি শুয়ে পরলাম।আর ইকবাল পাশে চেয়ারে বসে আছে…
চোখে এতো ঘুম আমার তার উপর ক্লান্ত খুব…
তবুও কেন যেন ঘুমাতে পারছিনা..

আমি:আচ্ছা গল্পের বই আছে?

ইকবাল: হুম আছে..কাল পড়েন এখন ঘুমান..

আমি: আমি পড়বো না…
আমার পড়তে ভালো লাগেনা।গল্পের বই পড়লে আগে দেখি কত পৃষ্ঠা…
আর শেষ পাতা আগে পড়ি..

ইকবাল: হুম আপনি তো পড়া চোর।

আমি: দু দিন টিচারগিড়ি করে আমায় চোর বলে দিলেন।
যাক, পারলে একটা গল্পের বই পড়ে শুনান..

আমি শুনি..মাথা ভাড়ি হয়ে আছে…
ইয়ারফোন ব্যাগে ওটা থাকলে গান শুনতে পারতাম।

ইকাবাল গল্পের বই নামালো।
আমি: কার বই?

ইকবাল: জাফর ইকবাল..

আমি: নিজের নামের সাথে মিল আছে তাই?

ইকবাল হেসে বলে হুম।

আমি: কাজে মিল নাই একটু ও।

বেচারার মুখ মলীন হয়ে গেল।

আমি: গল্পের কি নাম?

ইকবাল: জলমানব..

আমি: আচ্ছা পড়েন।

গল্প শোনার মন -মানুষিকতা কিছুই নাই…
শুধু ইকবাল কে ব্যস্ত রাখতে চেয়েছি..
ছেলে মানুষ বিশ্বাস নাই..
তারপর আবার তাদের বাসা..

আমি: আচ্ছা শুনুন…আপনি বাসার সবাইকে কি বলেছেন??

ইকবাল: আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছি তাই।

আমি: মিথ্যে বললেন কেন?খেঁজুর খালি খালি বলি?

ইকবাল: খেঁজুর?

ইস!মুখ ফসকে বের হয়ে গেল..এতদিন পিছনে বসে বলতাম আর আজ সামনা সামনি।

আমি: কিছুনা।

ইকবাল: সব কিছু বললে সবাই আপনাকে খারাপ ভাবতো।আমি তাদের ছেলে আমায় ঠিক ই ঘৃনা করতোনা কিন্তু আপনাকে করতো..
আর এরা গ্রামের মানুষ, অল্পতে হতাশ হয়ে যায়..

আমি: আচ্ছা আচ্ছা পড়েন আপনি।
সব পড়বেন কিন্তু।

ইকবাল পড়া শুরু করলো..”কায়িরা কোমরে হাত দিয়ে খানিকটা অনিশ্চিত ভঙ্গিতে ভাসমান….

এতটুকুই কানে গেল…
তারপর আমি ঘুমিয়ে পড়লাম…

ঘুম ভাঙলো দরজা নক করার শব্দে…

লাফ দিয়ে উঠে দেখি বাইরে এখনো অন্ধকার..
আর ইকবাল টেবিল এর উপর মাথা রেখে নাক ডেকে ঘুম.

ইতি ডাকছে নামাজ পড়ার জন্য..
এদের বাসায় প্রতিদিন ই ঈদ..
আমাদের বাসায় আমায় কেবল ঈদ এর দিনে সকালে ঘুম থেকে উঠাতো কিন্তু এখানে পুরো পরিবার ই পাখির আগে ঘুম থেকে ওঠে..

ইকবাল সারারাত টেবিল এ ঘুমিয়েছে।

কি বলে ডাকবো ভাবছি..

স্যারর…স্যার..

শুনছেনা..

ইকবাল বলে চেঁচালাম।
উনি উঠেই চোখ কোনমতে খুলে বই এর দিকে তাকিয়ে আবার পড়া শুরু করলো..”হেলিকপ্টারটি বেশ বড় “।।

আমি: হইছে আর হেলিকপ্টার দেখা লাগবেনা।আপনার বোন ডাকছে…নামাজ পড়তে…

ইকবাল দরজা খুললো..

ইতি: ভাইয়া ভাবিকে নিয়ে নামাজ পরে নিস।আমি এই দরজা সামনে থেকে খুলে দিলাম..

ইকবাল: ইতি আমি মসজিদ এ যাব এখন,তুই দেখিস তো লুবনার কিছু লাগে কিনা..
ইকবাল চলে গেল..
ইতিকে বললাম আমার ব্যাগ এনে দিতে,জামা পরবো..

ইতি: ভাবি নতুন বউ শাড়ি পরে থাকতে হয়.

আমি: এই নিয়ম আমি শুনিনি।আমি শাড়ি পরে থাকতে পারিনা।

ইতি: কাল আমার নানি,খালা আসবে জামা পরা দেখলে হাসবে।আমার নানি একটু সেকেলের কিনা,সব কিছুতেই দোষ খোঁজে..

আমি: সে আসবে কেন?

ইতি: বারে,নাতবউ কে দেখতে…
ভাবছি যে না নাতি তার আবার বউ।কি আর করার হাতি গর্তে পরেছে, লাথি খেতেই হবে।

শাড়ি পরিবর্তন করে আরেকটা শাড়ি পরলাম..

ইতি নামাজ যোহর থেকে পড়ি,তুমি কাউকে বলনা..
আসলে আমার খুব ক্লান্ত লাগছে..

ইতি মুছকি হেসে বললো আচ্ছা ভাবি..

ওর হাসির মানে আমি বুঝি তবে তা গায় মাখালাম না।

ইতি: আচ্ছা ভাবি আমি যাই আরেকটু ঘুমিয়ে নেই..

আমি: আমার সাথে ঘুমাও না প্লিস..

ইতি: ভাইয়া আসবেনা?

আমি: সে তোমার রুমে যাক। প্লিস ঘুমাও..

ইতি আমার পাশে শুয়ে পরলো..

ঘুম ভাঙল চেঁচামেচি শুনে..
উঠে আমার দু মিনিট লাগে মনে করতে যে আমি কই আছি..
আসলে বাসার বাইরে আমি থাকিনি একা কখনো..

কেউ একজন বলছে,নতুন বউ ১২টা পর্যন্ত ঘুমায়..

আমি তড়িঘড়ি করে মোবাইলটা নিয়ে দেখি বাজছে ১০:১৮..

কেমন উনি?সময় ভুল বলে..যাই গিয়ে ঘড়ির কাটা চিনিয়ে আসি..

বের হয়ে দেখি ইকবাল এর মা -বাবা আর দুজন মহিলা বসা..
এর মাঝে একজন বৃদ্ধা মহিলা..

সে বক বক করেই যাচ্ছে।

“আরে বিয়ের পর মেয়েরা ঘুম দিয়া উঠে সবার আগে।

শ্বশুর -শাশুড়ির খেদমত করে আর ইকবাল এ কি বিয়া কইরা আনছে?ওরে বললাম আসমারে বিয়া করতে..আসমা কত গুনি মাইয়া..

ইকবাল এর মা-বাবা কিছুই বলছেননা,কে এই মহিলা তাও আমি জানিনা…

আমি পাশে গিয়ে দাড়ালাম…

ইকবাল এর মা বলছে,বউ এই তোমার নানী শাশুড়ি আর এই তোমার খালা শাশুড়ি..

আমি সালাম দিলাম..

নানী : এ মা… বউ পর পুরুষ এর সামনে মাথায় কাপড় দিয়া আসতে হয় তাও জানো না?

আমি: পরপুরুষ কে?

নানী : কেন তোমার শ্বশুর..

আমি: বাবা আবার পরপুরুষ কি করে হয়?

ইকবাল এর বাবা আমার দিকে তাকালো..তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে খুশি হয়েছে যদিওবা আমি তাকে খুশি করার জন্য বলিনি..

নানী : তো শহরের মাইয়া..দেখলে তো ছোট মনে হয় তাইলে এতো তাড়াতাড়ি বিয়া করলা কেন?

তার একটা কথায় আমার বুকে ভিতর মোচর দিল
আমি কি বিয়ে করতে চেয়েছিলাম..আমার পক্ষে কি এতো কিছু মেনে নেয়া সম্ভব ছিল,তবে পরিস্থিতি সব সম্ভব করে দিয়েছে।
আমি তার কথায় আর উত্তর দিলাম না।

বাবা: আম্মা থাক যা হবার হয়েছে,ইকবাল খুশি থাকলেই আমরা খুশি।

নাটক -সিনেমায় দেখতাম শাশুড়িরা বউকে নির্যাতন করে..
আর এখন দেখছি নানী শাশুড়ি ও।

আমার ঘর বাঁচানোর দায় নেই তাই আমায় কিছু বলুক একবার তাহলে আমিও প্রতিবাদ করবো..

এর মাঝে ইকবাল এর মা বললো চা করে আনতে।
চা আমি করতে পারি।বাসায় আমি ই চা করতাম সবসময় তাই কাজটা আমার অপছন্দ নয়…

কিন্তু এখানে যে উঁনুন তাতে আমি করতে কিছুটা ভয় পাচ্ছি।

ইতি আসলো আমায় সাহায্য করতে..
মেয়েটা যেন আমার অনেক দিনের আপনজন।

আমি ফিস ফিস করে জিজ্ঞেস করলাম ইতি আসমা কে?

ইতি কিছুক্ষন চুপ করে রইলো।

আমি: না বলতে চাইলে থাক..

ইতি: আমার খালাতো বোন..নানির পাশে যে খালা বসা তার মেয়ে।ভাইয়ার সাথে বিয়ে দিতে চাইছিল।

আমি: তারপর?

আমি জানিনা আমার কেন এতো কৌতুহল হচ্ছে?ইকবাল এর বিয়ে না যেন যা ইচ্ছে তাই হোক তাতে আমার কি?

ইতি: আব্বা বলছিল ভাইয়া চাকরি করবে তারপর।
আসমা আপু খারাপ না ভাবি,ভাইয়ার সাথে কিছুই ছিলনা তুমি আবার ভাইয়াকে ভুল বুঝোনা।

আসমা আপুও আসছে,হয়তো সামনেই আছে…

আমি: তোমার ভাইয়াকে দেখছো?

ভাবছি,হয়তো আসমার সাথে দেখা করতে গেছে।যাক তাতে আমার কি?উনি আমার কেউ নন শুধুই আজ আমার অবস্থা আমার পক্ষে নেই তাই।

ইতি:ভাইয়া বাড়ি যতক্ষণ থাকে ঘরে থাকে শুধু রাতে।সারাদিন ঘুরে বেড়ায়।নামাজ পড়ার পর আর আসেনি।

সবাইকে চা দিয়ে আমি রুমে গেলাম।
মাঝে মাঝেই বিভিন্ন মানুষ আসে আমায় দেখতে,কি অদ্ভুত মনে হচ্ছে ভিন্ন গ্রহ থেকে এলিয়েন এসেছি তাই জনে জনে আমায় দেখতে আসছে।

দুপুর হয়ে গেল ইকবাল সাহেবের খবর নাই…

আমি কানে ইয়ার ফোন লাগিয়ে গান শুনছি..

এর মাঝেই রুমে এসে নানীর
চিৎকার..

বউ এর কি লজ্জা নাই..?
ঘরের বউ থাকবে বউ এর মতন,তা না সে কানে তার লাগাইয়া শুয়ে আছে..

আমাগো বিয়ার সময় লজ্জায় ৩মাস মাথা উঁচু ই করিনাই..
এই বলে চলে গেল..

আমি ওনার কথা বসে বসে শুনেছি..
কিছুই বলতে পারিনি..

ইকবাল আমায় একা রেখে চলে গেল।অবশ্য যাবে নাই বা কেন! কে আমি?আমায় তো সে দয়া করেছে…

আমি কাঁদছি মহিলার কথা শুনে নয়..
কথা শুনতে আমার অভ্যাস হয়ে গেছে…

কাঁদছি আমার কপালের কথা ভেবে..
এর মাঝে ইতি এসে বলে,ভাবি তুমি ওনার কথায় মন খারাপ করোনা।উনি ওমন ই..

আমি: তোমার ভাই কি এলো?

ইতি :না

ইতি আসমার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিল।কেন যেন এই আসমা মেয়েকে আমার হিংসা হয়।কেন যেন এই মেয়েকে আমি সহ্য করতে পারিনা।

আসলে আমি কি চাই বা কি চেয়েছিলাম সব ই আমার অজানা তেমনি অজানা আমি কি করবো সেটা..

সন্ধ্যা হয়ে গেল ইকবাল এখনো আসছেনা..

কিছুক্ষন পরে বাহির থেকে কে যেন জানালায় টোকা দিল..

আমি সেটা আবার শোনার জন্য জানালার পাশে গিয়ে দাড়ালাম

আবার টোকার শব্দ এক সময় জিজ্ঞেস করলাম কে?

ওপাশ থেকে ইকবাল ধীর গলায় বলছে,আমি,লুবনা জানালা খুলুন।

ভাবছি আমিও আধা ঘন্টা পর জানালা খুলবো।অপেক্ষা করার কষ্ট বুঝুক।
জানালা খুলে দেখি দাড়িয়ে আছে।

আমি: এখান দিয়ে রুম এ আসবেন কি করে?
সামনের দরজা দিয়ে আসুন।

ইকবাল: আমার হাতে একটা প্যাকেট দিয়ে বললো এই নিন।

আমি: কি এটা?

ইকবাল: জিলাপি । আমাদের এখানে খুব ভালো বানায়..

আমি: বাসার সবাইকে দিব?

ইকবাল: না এটা শুধু আপনার। বাসার কাউকে দেখাবেন না।

আমি: ইতি কে ছাড়া খাব না।

ইকবাল: ওর জন্য এনেছি।আমি দিয়ে দিব।
আমি জানিনা সে কেন আমায় আলাদা দিল।তবে আমি তার কথা মতই লুকিয়ে রেখেছি খাবার..

এর মাঝে ইকবাল আসলো ঘরে।

ইকবাল এর নানী ইকবাল কে জড়িয়ে ধরে আবার কাঁন্না।

এখানে রিতি এমন ই হয়তো,ছেলেরা বিয়ে করলেই তারে জড়িয়ে ধরে কাঁদে।আর মেয়েদের না আছে হাসা বা না আছে কাঁদার অধিকার।

ইকবাল এর মা ইকবাল কে বলছে,নতুন বউ ঘরে একা রেখে কই ছিলি সারাদিন?

ইকবাল: কেন তোমরা আছোনা?
ইতি এই নে জিলাপি ।

ইতি: ভাবির হাতে দে।

নানী : বিয়ে হতে না হতেই বউর হাতে সব দিলে বউ মাথায় উঠে নাচবে।
তোদের নানা আমায় প্রশ্রয় দিতনা।
বউ আশ্রয় দেবার জিনিস,প্রশ্রয়না।

ইতি তবুও জিলাপি এনে আমার হাতে দিল।

আমি: ইতি তুমি খাও।আমি খাইনা বলে ইকবাল এর দিকে তাকিয়ে দেখি সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে…

এর মাঝেই আসমা এসে বলে,ভাবি মনে হয় রাগ করছে যাও ইকবাল ভাইয়া বউ এর মান ভাঙাও।

ইকবাল এর মা: ইকবাল বিয়ে কইছিস তাই যা আনবি বউ কে দিবি।আজকালকার বউরা অনেক কিছুই আশা করে। আগের যুগ আর নাই এখন।

এক খাবার নিয়ে এতো কাহিনী এ ঘরে,এর জন্যই আলাদা আমায় দিয়েছে।

ইকবাল রুমে গেল তারপর আমিও গেলাম.

শুনছি আসমা বলছে,বর কে চোখে হারাচ্ছে।
আমি কানে নিলামনা।

ইকবাল : খেয়েছেন?

আমি ওর কথার উত্তর দিলাম না.
সারাদিন কই ছিলেন?

ইকবাল: মসজিদ এ ঘুমিয়ে ছিলাম।রাতে ঘুম হয়নি।

আমি: আপনার ঘর নাই?

ইকবাল: মসজিদে ঘুমাতে শান্তি আছে অনেক।

আসলে,ঘরে তো অশান্তি অনেক আর তা হলাম আমি। সেটা আমি খুব বুঝি ইকবাল বলুক আর না বলুক।

ইকবাল: আমার বাসার কারো কথায় কিছু মনে করবেন না।

আমি: আসমা কে?

ইকবাল: আমার খালাতো বোন।

আমি: তা আমি জানি বাকিটা বলুন।

ইকবাল: বাকি কি? আমার খালা আর খালুর মেয়ে।

ইকবাল আমায় হয়তো বলতে পারছেনা বা চাইছেনা। আমার ও উচিৎ না কারো পার্সনাল বেপার নিয়ে খোঁচানো…

আমি: তা কি ভাবছেন?

ইকবাল: কি?

আমি: আমরা এখান থেকে যাব কবে?

ইকবাল: আমি ২-১দিন পর ই যাব। আপনাকে মা মনে হয় এতো তাড়াতাড়ি যেতে দিবেনা।

আমি: মানে?

ইকবাল: হুম নতুন বউকে এখনো অনেকের দেখা বাকি।

আমি: কিসের বউ বউ করছেন আপনি?
তারা না হয় জানেনা?
আপনি তো জানেন?
এ বিয়ে অবৈধ,এ বিয়েতে আমার মত ছিলনা,এ বিয়ে আমি চাইনি..
আপনি কি ভাবছেন আমি সব মেনে নিয়েছি?
আচ্ছা আমার সাথে আপনাকে যায়??
এমন ঘরে থাকা যায়? সবাই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কথা বলে।বিয়ের কাজ বিয়ে করেছি।চলেও যাব সময় মত।

ইকবাল কোন কথা না বলে রুম থেকে চলে গেল।

আমি জানিনা এসব আমি কেন বলছি।ইকাবাল এর প্রতি রাগ এর কারন টা শুধু বুঝতে পারছি তা হল আসমা।কিন্তু সেই রাগের কারনটা আমি মানতে পারছিনা।নিজের মনের প্রতি নিজের ই লজ্জা লাগছে।

আজ রাতে আর ঘুমাবোনা। সকাল-সকাল উঠে আমি ই আজ সবাইকে নামাজ পড়তে উঠাবো।
নানীর মুখ এ ছাই দিব আমি।

রাতের খাবার শেষ করে আমি এসে শুয়ে শুয়ে গান শুনছি।বাবা-মায়ের কথা মনে পরছে।আসার পর তাদের সাথে একটু কথাও বলিনি।ইচ্ছে করেই বলিনি,রাগ- অভিমানে..

বাবা-মা চিন্তায় ই শেষ হয়ে যাচ্ছে হয়তো..

এর মাঝে ইকবাল রুমে আসলো,আমি ওনার সাথে কথা না বলে অন্য দিক ফিরে শুয়ে আছি।হয়তো সেও কথা বলবেনা।

ইকবাল: কাল রাতে গল্পটা শেষ পর্যন্ত না শুনেই ঘুমিয়ে গেছেন।আজ বাকিটা পড়বো?..

আমি উঠে বসলাম,কেন আপনাকে গল্প পড়তে বলছি?
নিজেই তো টেবিল এর উপর হা করে ঘুমিয়ে পরলেন..আবার বলেন আমি ঘুমিয়েছি।
শুনুন,বিছানায় আসুন।আবার কাল মসজিদ এ গিয়ে ঘুমাবেন তা আমি চাইনা।

ইকবাল বিছানার এক পাশে এসে শুয়ে পড়লো।আমি বসে আছি ইকবাল এর ঘুমের অপেক্ষায়।কিছুক্ষন পর ইকবাল কে বললাম ঘুমিয়ে পরেছেন?

ইকবাল: না..

আমি: আমার না ক্ষুধা লাগছে।সবার সামনে লজ্জায় আমি খেতে পারিনি।

ইকবাল উঠে বসলো কিসের লজ্জা খেতে আবার?দাড়ান দেখছি খাবার আছে কিনা.

আমি: যেতে হবেনা,টেবিল এর ড্রয়ারের মধ্যে জিলাপি আছে আমি তখন খাইনি।

ইকবাল: খান নি কেন?এখন তো ঠান্ডা হয়ে গেছে..

আমি: বারে,আপনাকে রেখে খাব কেন?

দুজন রাতে জিলাপি খাচ্ছি..
ইকবাল: বেশি আনতাম কিন্তু আমার কাছে টাকা ছিলনা..

আমি: বেশি আনলে মজা লাগতো না।

আচ্ছা রাতে ঘুমিয়ে গেলে সকালে উঠতে পারবোনা।তার চেয়ে সারারাত জেগেই থাকি।

ইকবাল: আমি উঠিয়ে দিব ঘুমান।রাত জাগলে দিনেও ঘুমাতে পারবেন না।
বাড়ছে রাত,বাড়ছে ঘুমের নেশা।
ইকবাল আর আমি দুজন দুদিকে ফিরে শুয়ে আছি।

আমি: আচ্ছা জলমানব এর শেষে কি হয়েছিল?.

ইকবাল: নায়িকা জলমানবের সাথে সাগরে চলে গেল..

আমি: নায়িকা সাগরের মাঝে কি করে থাকবে?অক্সিজেন পাবে কি করে? দ্বীপ ঢুবে গেলে মরে যাবেনা?

ইকবাল: গল্পে ভালোবাসাই অক্সিজেন..

আমি হাসি দিয়ে চোখ বন্ধ করলাম।খেজুর আবার ভালোবাসাও বোঝে..

চোখে ঘুম ভর করেছে।চোখের সামনেই এক জলমানব প্রেমিক ভেসে আসছে আর তার নায়িকা হিসেবে নিজেকে মনে হচ্ছে।নায়কটার চেহারা স্পষ্ট বুঝছিনা।ঘুমে ক্রমানয়ে আবছা হয়ে আসছে সব..

ঘুমিয়ে যেতে না যেতেই কানের কাছে ইকবাল ফিস ফিস করে আমার নাম ধরে ডাক দিল..

সমূদ্রের তীরে ইকবাল বসে আছে।আর ওর বুকে মাথা রেখে আমি..
ঠান্ডা বাতাস দিচ্ছে সাথে আমার চুলের ঝাঁপটায় ইকবাল এলোমেলো হচ্ছে..

শীতল শরীর ক্রমানয়েই আরো শীতল হচ্ছে।আমি ইকবাল কে শক্ত করে ধরলাম।ওর উষ্ণ নিঃশ্বাস আমার চুল ভেদ করে ঘাড়ে লাগছে …
ওর খোঁচা খোঁচা দাড়ি আমার গালকে স্পর্শ করলো তাতেই আমার ঘুম ভেঙে গেল..
চোখ খুলতে না খুলতেই আমি টের পেলাম ওর দাড়ি ঠিক ই আমার গালে স্পর্শ করছে।আমি ওকে ঠিক ই শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছি।আর ইকবাল আমার নাম ধরে ডাকছে বার.বার..

ঠিক এভাবেই স্বপ্নেও ডেকেছিল।ইকবাল কে ধাক্কা দিলাম।
ও হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে..

আমি: এসব কি?এই না আমি আপনাকে বিশ্বাস করে ছিলাম..
এই বলে আমি কেঁদে দিলাম..

ইকবাল চুপ করে আছে..

আমি: আসলে পুরুষ আর হিংস্র পশুকে আস্থা করতে নেই।আমার দূর্বলতার দাম এভাবে দিলেন?
তারচেয়ে আমায় মেরে ফেলতেন?

ইকবাল: কি বলছো?

আমি: এর মাঝে তুমি করে বলা শুরু করছেন?ছিঃ.. ছিঃ

ইকবাল: আমি আপনাকে যেই ডাকতে গেলাম যে নামাজ পড়ার সময় হয়েছে আর আপনি সেই আমায় জড়িয়ে ধরলেন তাতে আমার কি দোষ…

আমি!জড়িয়ে ধরেছিলাম!তা তো স্বপ্নে ধরেছিলাম কিন্তু বাস্তবে কি করে..!

আমি: ও..আসলে রাতে জলমানব এর নায়ক কে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়েছিলাম..

ইকবাল: তো স্বপ্নে নায়ক কে জড়িয়ে ধরেছিলেন বুঝি?

লজ্জা লাগছে খুব…বলা উচিৎ হবেনা যে আমি নায়ক হিসেবে তাকেই দেখেছি তাহলে খেজুর এর ভাব বেড়ে যাবে..

আমি: নায়ক পাব কই!দেখি ইয়া বড় ডলফিন মাছ কে শিকার করেছি আমি।

ইকবাল: হা হা হা।

আমি: হাসির কি বললাম?

ইকবাল: না ঘুম ভেঙে উঠে দেখেন পুঁটি মাছ শিকার করছেন?

আমি: না বিড়াল।

ইকবাল চোখ বড় করে বলছে,এই মেয়ে স্যার কে বিড়াল বলা পাপ..

আমি: স্যার কে না বরকে বলছি বলেই আমি থতমত খেলাম।

ইকবাল কথা এড়িয়ে নিয়ে বললো নামাজ এর সময় পাবেন না কিন্তু।

আমি: হুম উঠি।

ইকবাল: আপনি চুলে কি আতর দেন?

আমি ইকবাল এর দিকে রহস্য নিয়ে তাকিয়ে বললাম আতর কেউ চুলে দেয়?

ইকবাল: চুলের ঘ্রান অনেক সুন্দর। এমন ঘ্রান এর আতর খুঁজি আমি, কিন্তু পাইনা।

আমি: একটা কাজ করেন..

ইকবাল: কি?

আমি:আমায় মেশিন এ দিয়ে আতর বানিয়ে নিন।আতর এর নাম লুবনা আতর।

ইকবাল: হুম ভালো আইডিয়া।

আমি রাগ হয়ে বললাম, কি?বললাম আর উনি রাজি।

যান মসজিদ এ,আমি একজন কে নামাজ পড়তে উঠাতে যাই।

ইকবাল: কাকে?

আমি দরজার কাছে গিয়ে পিছন ফিরে ইকবাল এর দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে বললাম আপনার নানী কে..

ইকবাল হাসি দিয়ে বলে আপনি পারেন ও।

ইদানীং এই নতুন পরিবেশ আমার ভালো লাগছে।ভালো লাগে নামাজ পড়াতে উঠাতে।
আমার ১৭বছর বয়সে আমি এমন কখনো নামাজ পড়াতে উঠি নি।

দুপুরবেলা ইকবাল আবারো আমায় খাবার এনে দিল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম টাকা পেলেন কই?

বললো মা দিয়েছে।আপনি তো আবার লজ্জায় খেতে পারেন না তাই খাবার রুমের দরজা বন্ধ করে খান…

আমি দরজা না বন্ধ করে খাচ্ছি আর ইয়ারফোন এ গান শুনছি।

এর মাঝে নানী রুম এ আসলো।আমি টের পেয়েই খাবার লুকিয়ে ফেললাম।

আমি: নানী বসেন।

নানী : ওই তার দিয়া কি শুন সারাদিন?

আমি: আপনি শুনবেন?ভালো লাগবে বলে ওনার কানে দিলাম।উনি কিছুক্ষন চুপচাপ করে চিৎকার দিল ওরে আল্লাহরে আমার কান গেলরে…
আমি কানে কিছু শুনিনা..
এক লাফ দিয়েই ইকবাল এর মায়ের কাছে গেল।ওনার চেঁচানো শুনে ইকবাল, ইতি ঘরের সবাই এসে পরেছে।

ইকবাল: কি হয়েছে নানী?

নানী : ইকবালরে আমার কান গেল..আমি কিছুই শুনিনা এখন।

ইকবাল: কি হয়েছে বলবা তো?

নানী : তর বউ আমার কানে কি যেন তার লাগাইয়া দিছে..ঠাডা পরার মতন শব্দ আসে তা দিয়া।আমার কান গেল।

আমি: আপনি কানে না শুনলে এসব প্রশ্নের উত্তর কি করে দেন?

নানী : দেখ দেখ আবার মুখে মুখে কথা কয়।

ইকবাল: দেখুন লুবনা নানী এ যুগ এর নয় তাকে আপনি ওসব না দিলেও পারতেন।

নানী : এতো মহব্বত দিয়া কতা কইছ না তো।তোর নানায় আমায় মারতো। একটু পুরুষ হ।তোর নানায় জ্যাতা থাকতে কি আমার ভুতে ভয় ছিল?

আমারে রাত ৩টায় ও লড়ানি দিত।আমি বাগান-কবরস্থান এ গিয়া পলাইতাম।

ইকবাল কিছু বলছেনা…
সবাই ই নানী কে নিয়ে ব্যস্ত।আমার কথা বা আমাকে বোঝার মতন কেউ নাই।

আমি আমার রুমে চলে আসলাম।আমার ঘৃনায় কাঁন্না আসছে বার বার।বাকি কারো কথায় ঘৃনা লাগেনা।ঘৃনা কেবল ইকবাল এর কথায়…

কিছুক্ষন পর নানী আসলো..
আমায় বলে: বউ মন সংসার এ দেও।গান এ দিও না।

আমি: আপনার স্বামী আপনাকে মারতেন?

নানী : হ কত মাইর খাইছি।মারতো আবার সোহাগ করতো…
যখন মারতো তহন আমি তার রাগ তার জামাকাপড় এর উপর ঝারাইতাম।

আমি: জামাকাপড়?

নানী : হুম তার জামাকাপড় মাটিতে ফালাইয়া পা দিয়া লাথি দিতাম মনে মনে ভাবতাম তারে লাথি মারি।

আমি: উনি দেখতেন না?

নানী : না সে আসার আগেই জামাকাপড় আবার গুছিয়ে রাখতাম।

আমি:আসলে আপনার স্বামি দূর্বল ছিল।ওনার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে এখন সে বেঁচে থাকতো আর আপনি কবরে।যে কাজ করেন তাতে মারার কাজ ই করেন।

নানী চিৎকার দিয়ে ইকবাল কে ডাক দিল।

ইকবাল : কি হয়েছে?

নানী : তুই বিচার কর..এই মাইয়া আমারে মারতে চায়।

আমি: ও আমার বিচার করার কে?
ওরে আমি আমার কিছু মানি না।
আমি থাকবো না এখানে।

ইকবাল: নানী একটু শান্তি দেও আমারে।আমারে বাঁচতে দেও তোমরা।

কথাগুলি আমাকেই শুনাচ্ছে।

আমি মাকে কল দিলাম। মা-বাবা আসলো বিকালে।আমি চলে যাব।
ইকবাল একবার ও আমায় রাখতে চাচ্ছেনা।
মা-বাবা বাড়ির পরিবেশ দেখে এখন আর আমার বিয়ে নিয়ে খুশি নন।তারা পারলে আমায় আজ ই ডিভোর্স দেয়ায়।ইকবাল এর সাথে কথাও বলছেনা আমার মা।

বাসা থেকে বের হবার সময় সবাই এসেছে শুধু ইকবাল কে দেখছিনা।
ওকে খুঁজছি আমি কিন্তু ও নেই।

একবার যদি আমার হাত ধরে বলতো যেও না আমি থেকে যেতাম।

ইকবাল এর নানীর কাছে গিয়ে শব্দ না করেই মুখ নাড়িয়ে বললাম ভালো থাকবেন।
নানী : কি কও?

আমি আবারো একই ভাবে বললাম।
উনি কেঁদে কেঁদে বলে উঠলো এই আমি এখন সত্যি সত্যিই শুনিনা।

ইতি: নানী তার মানে তুমি অভিনয় করছিলা?

আমি: বাদ দেও।আসলে আমার জীবন ই অভিনয়ের মঞ্চ।
বাবা-মা উঠোনে দাড়িয়ে আছে।
আমি বাসা থেকে নামার সময় ইকবাল এর বাবা বললো মা রাগ অভিমান সবার ই হয় তাই বলে চলে যাবা কেন?

আমি: বাবা আমি এমনিতেই যাচ্ছি। ক্লাস মিস যাচ্ছে।
এই প্রথম আমার বাবাকে ছাড়াও কাউকে বাবা বললাম।

মা: তাহলে ইকবাল কেও নিয়ে যাও?

আমার মা: না সে তার সময় মত যাবে।

ইতি: ভাবি তুমি আজ যেওনা।

ইকবাল কি কপুর এর মতন উবে গেল!দেখছিনা ওকে…

আমি আমার বাসায় চলে আসলাম।মন একবার বলে আমি ভুল করছি তো,আমি ১০বার বলি না আমি ই ঠিক..

ইকবাল কে মনে পরছে।বর হিসেবে না হলেও বন্ধু হিসেবে ও।খুব মায়া ধরে গেছে।

আমার এ মায়া কাটিয়ে উঠতে হবে।

একবার কল দিব ভাবছি কিন্তু আমার কাছে ইকবাল এর নম্বর টা ও নেই।
মায়ের কাছে চাইতেও লজ্জা লাগছে।

আমি ই মনে হয় প্রথম বউ যার কাছে বর এর মোবাইল নম্বর নেই।

সারারাত শুধু আমার সাথে ঘটে যাওয়া দিনগুলির কথা ভাবছি।বার বার ইকবাল এর সেই মুখ আমার চোখে ভেসে আসছে।
ঘুমে চোখ লেগে গেল,ঘুম ভাঙলো আযান এর শব্দে।
আমি উঠেই পাশে ফিরে চোখ বন্ধ করে ডাকছি,ইকবাল নামাজ এর সময় হয়ে গেছে তো..ওঠো..

তাকিয়ে দেখি কেউ নেই।আমি একা..

তাকিয়ে আমার কিছুসময় লাগলো মনে করতে আমার জায়গাটা।ইকবাল কে আর জাগানো হবেনা আমার।এটা ভাবলেই চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে।
এখন আমি ঠিক ই নামাজ পড়ি নিয়ম করে শুধু সেই মানুষ নেই যে আমায় শিখালো..

আসলে ধার্মিক মানুষ হলো ঝর্নার মতন।তাদের সংস্পর্শে যে কোন ঘোলা পানি গেলে তা পরিষ্কার -স্বচ্ছ হয়ে যায়।

আমি হয়তো সেই ঝর্না থেকে প্রবাহিত হয়ে স্রতে অন্যদিকে চলে যাচ্ছি। সে ঝর্নার খোঁজ হয়তো আমার ইহকালে মিলবেনা..
শুনছি মা কার সাথে যেন খুব খারাপ ভাবে কথা বলছে।
যেই শুনলাম সে বলছে আমার মেয়েকে আর তোমার সাথে দিব না আমার বুঝতে বাকি রইলনা যে ওটা ইকবাল।

আমি দরজার আড়ালে গিয়ে শুনছি মায়ের কথা।খুব মন চাইছে মায়ের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে শুনি ওর কথা।
মা বলছে খুব তাড়াতাড়ি সব কিছু থেকে মুক্তি পাবে…আর কল দিবেনা বলে ফোন রেখে দিল।

আমি ইদানীং আর হাসতে পারিনা।একা ঘরেই বসে থাকি।
মা আসলো আমার রুমে।
আমি: মা রুবেল কে দেখলাম না আসার পর একবার ও?

মা: আরে তুই তো জানিস না।সে ছেলে তো জেলে?

আমি: কেন?

মা: জামিল এর বউ এর ঘরে রাতে চোরের মতন ঢুকে বসে ছিল।
এলাকার মানুষ ধরে মেরে জেলে দিছে।

ভাবছি এই সেই মানুষ যে এককালে আমার বিচারক ছিল।যার জন্য আমার জীবন এলোমেলো হয়ে গেছে।

আচ্ছা কিছু কিছু এলোমেলো জিনিসের মাঝেও হয়তো কিছু মূল্যবান জিনিস লুকিয়ে থাকে..

মা: কি ভাবছিস?

আমি: না কিছুনা।ইকবাল কল দিয়েছিল?

মা: ওর কথা বাদ দে।কি নোংড়া পরিবেশে থাকে।

আমি: না জেনে বিয়ে দিয়েছিলে কেন মা?

মা: আমি কি বুঝেছি ওমন ছেলে ওই পরিবেশ এর।তুই চিন্তা করিসনা আমি যেমন বিয়ে দিয়েছি আমি ই এর সমাধান করবো।

আমি: সমাধান?এখন সমাজ কিছু বলবেনা?

মা: বললেও বেশিদিন না।ভুল থেকেই শিখেছি।

আসলে কিছু মানুষ শুধু জন্মই নেই কিন্তু তাদের চালনাকাঠি থাকে অন্য কারো হাতে।
তারা চাইলে গড়বে আবার দুমড়েমুছরে দিবে।

যাক তাতে ইকবাল ও হয়তো শান্তিতে থাকবে।ও তো বাঁচতেই চায়।

বলতে বলতে ৪মাস কেটে গেল।কারো সাথেই আমার যোগাযোগ নেই।ইকবাল প্রায় ই মাকে কল দেয়, মা হুমকি দেয় বাসায় আসতে বারন করে।আর ইকবাল ও আর আসেনা।

২৩শে নভেম্বর..মা সকালে উঠেই দেখছি খুব খুশি।
আমার রুমে এসে আমার মাথা তার বুকে চেপে ধরে বলছে লুবনা অপেক্ষার দিন শেষ..

আমি তার এতো খুশির কারন বুঝছিনা।শুধু বুকের ভিতর চিনচিন ব্যথা অনুভব হচ্ছে।
শুনছি কোন ভাঙার শব্দ।আমি জানি আমি আবারো কিছু হারাতে যাচ্ছি..

আমি: কি মা?

মা: কাল তোদের ডিভোর্স এর ডেট পরেছে।

আমি এই ভয় ই পেয়েছিলাম।এতদিন কিছুর আশায় বেঁচে ছিলাম এখন সে আশার ও মৃত্যু হতে চলেছে।

মা তার ফোনটা হাতে দিয়ে বললো নে তুই ই ইকবাল কে জানা।

এই প্রথম আমি ওর সাথে ফোনে কথা বলবো হয়তো এই শেষ।

কল রিসিভ করেই সালাম দিল।
আমি উত্তর নেয়ায় আমার কণ্ঠ বুঝে ফেললো।

ইকবাল: লুবনা কেমন আছো?

আমি এর উত্তর দিলাম না। আসলে দিতে পারছিলাম না।আমি কেমন আছি তা আমি নিজেও জানিনা।

আমি: কাল ১০টার দিকে এডভোকেট মন্সুর আলম এর চেম্বার এ আসবেন।মা কে কল দিবেন মা ঠিকানা জানিয়ে দিবে।

ইকবাল: কেন?

আমি: উকিল এর কাছে কেন যায়! ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে।আমার আর আপনার মাঝে আছে এক অবৈধ বিয়ের ঝামেলা তা থেকেই মুক্তি।যদিওবা এ বিয়ের মুক্তি করতে দলিল লাগেনা।যেখানে পরাধীন এর বেপার নেই সেখানে মুক্তি ও লাগেনা।

ইকবাল চুপ করে আছে..

আমি: কি রাখবো?

ইকবাল: আমি বিয়ে করার সময় ও নিজের কথা ভাবিনি।আজ ও ভাববো না।নিজের জন্য কিছুই চাওয়ার নেই লুবনা।
শুধু একটি কথাই,কারো কথা নিজের মুখে বসানো যায় কিন্তু কারো ইচ্ছে নিজের মন এর উপর চাপিয়ে দিলে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।আমি সেই দীর্ঘনিঃশ্বাস নিয়ে কাটিয়ে দিতে পারবো। কিন্তু আশা করি তুমি সুস্থ ভাবেই নিশ্বাস নিবে।

ওর গলার স্বর পাল্টে যাচ্ছে ক্রমাগত।কাঁপা গলায় কথা বলা যায় ঠিক ই তবে কথার মাঝে বেশ ফারাক।

আমি: আপনি ও ভালো থাকবেন আসমা কে নিয়ে।মানাবে খুব।বউ একেবারে বউ এর মতন ই।
ইকবাল: মানুষ ভুল অনেকবার ই করে তবে ভুল থেকে শিক্ষা একবার নেয়া হলে আর করেনা।আমার শিক্ষা কি এখনো নেয়া হয়নি?

আমি: আচ্ছা আমি রাখি।

ওর কথায় আমি দূর্বল হয়ে যাচ্ছি। আমি ওর কাছে হারতে চাইনা।নিজের কাছে হারি বার বার তবুও ওর কাছে নয়।

দুপুরে ও যে খাতায় গনিত কষেছিল আমি সে খাতার ঘ্রান নিচ্ছি।এখনো সেই আতর এর ঘ্রান তবে তা স্পষ্ট নয়।ইকবাল এর মতন ধীরে ধীরে ঘ্রান ও দূরে সরে যাচ্ছে..

খাতা টা কাছে নিয়ে বিছানায় শুলাম।

কিছুক্ষন এর মাঝেই কলিংবেল এর শব্দ।আমি দরজা খুলতেই দেখি ইকবাল আর আসমা।আসমা লাল শাড়ি পরা আর ইকবাল পিছনে।কি মলীন মুখ..

আসমার হাতে কাগজ।আমায় দিয়ে বললো এটায় সিগনেচার করে দেও।

আমি বললাম কি এটা।

আসমা হেসে বললো এটা তালাক এর দলিল।

ইকবাল চুপ হয়ে দাড়িয়ে আছে।কিছু বলছেনা।
আর আসমা হাসছে..কি ভয়ানক সে হাসি…
হাসির শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে তাকিয়ে দেখি বিকাল হয়ে গেছে।

আমি ঘুমিয়ে পরেছিলাম।
আমার মন কিছুতেই স্থীর হচ্ছেনা।কাল কি এভাবেই আসমা হাসবে!
আমি কিছুতেই তা মানতে পারবোনা..

মা ও দেখছি ঘুমাচ্ছে।আর আমি মাকে না বলেই বাসার পোষাক পরে রওনা দিলাম ইকবাল এর বাড়িতে..

বার বার ভয় হচ্ছে গিয়ে হয়তো দেখবো আসমাকে বউ সাজে।
বার বার সেই স্বপ্নের কথা মনে পরছে।

বাস থেকে নামলাম রাত ৮টায়। চারদিকে অন্ধকার।ভয় করছে খুব তার ভিতরে মনের ভিতর কিছুক্ষন যাবত ই কিছু শেষ হবার আভাস পাচ্ছি।

দূরে একজন কে দেখলাম লাইট নিয়ে আসতে।
কাছে আসতেই দেখলাম ইকবাল এর বাবা।

আমি বাবার পায়ে পরে কেঁদে দিলাম।
বাবা ও কাঁদছে।

আমায় তুলে বললো মা,সংসার খুব কঠিন বেপার এ নিয়ে খেলিস না।ইকবাল, তুই যাবার পর থেকে কারো সাথে কথা বলেনা।আমার ইচ্ছে ছিল ওকে শিক্ষিত বানাবো কিন্তু এই ধাক্কা ও নিতে পারবেনা।

আমি: বাবা এর পর আর এমন কিছু হবেনা।

দুজন মিলে বাড়িতে গেলাম।মা-ইতি সবাই আমায় দেখে খুশি। কিন্তু ইকবাল কে দেখছিনা..

আমি: ইতি তোমার ভাইয়া কই?

ইতি:রুমে আছে।তুমি যাও

আমি রুমের সামনে গিয়ে দেখি দরজা দেয়া।
নক করলাম।কোন সাড়া নেই।এখনো কি ৩০মিনিট পর দরজা খুলবে নাকি!!

আবার নক করলাম।
ওপাশ থেকে বলছে: আমি পরে খাব তোমরা খেয়ে নেও।

উমহ! ওনাকে নাকি খেতে ডাকি..

আমি আবারো ধাক্কা দিলাম দরজায়।

ও খুলে আমায় দেখে তাকিয়ে আছে অবাক হয়ে।
মনে হচ্ছে মাথায় বাজ পরেছে…

আমি: দেখি সরেন সামনে থেকে।আমি রুমে যাব।

ইকবাল: আপনি?

আমি: হুম গল্পের শেষ টা শুনতে এসেছি।

ইকবাল: তারপর আবার চলে যাবেন..?

বেচারার চোখ লাল হয়ে আছে..

আমি: হুম যাব। না হলে আসমাকে বিয়ে করবেন কি করে?

বিছানায় দেখি আমার গামছা পরে আছে।

আমি: গামছা এখানে কেন?

ইকবাল: চুলের আতর এর ঘ্রান নিচ্ছিলাম।গামছায় লেগে আছে।

আমি ওর কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলছি,আতর টা কি খুব পছন্দ হয়েছে?

ইকবাল: হুম।

আমি: আমার কাছে আছে।।গায়ে দিবেন?

ইকবাল : দিন।

আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম এই যে আতর দিয়ে দিচ্ছি।এখন থেকে যখন লাগবে তখন ই চাইবেন।

ইকবাল ও আমায় শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলছে,আল্লাহ এ আতর শুধু আমার জন্যই সৃষ্টি করেছেন।

আমি: আমার খুব ক্ষুধা লাগছে চলুন খেয়ে আসি।দীর্ঘ চার মাসের ক্ষুধার্ত আমি।

ইকবাল: চলুন একসাথে খাই।

বাসার সবাই মিলে রাতের খাবার খেলাম।
রুমে গিয়ে শুয়ে পরলাম।ইকবাল আসছেনা।
মাকে কল দিয়ে জানিয়ে দিলাম যে আমার পক্ষে এর বিপরীত কিছুই করা সম্ভব নয়।

অপেক্ষা করতে করতে শুয়ে পরলাম।মনে হয় রাতেও মসজিদ এ গিয়ে ঘুমাবে।এই খেজুর রা এতো বেরসিক কেমনে হয়!
বিরক্তিকর…

নভেম্বর এর শেষ দিক।গ্রামে প্রচুর ঠান্ডা পরে এই সময়।বিছানায় শুয়ে ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি।

এমন সময় টের পেলাম…ইকবাল এর আসার।
ওর আসার শব্দ পেয়ে আমি ঘুমানোর ভান ধরলাম..

ও এসে আমার পাশে খাট এর সাথে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে।
আর আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

বিরক্তি লাগছে..এভাবে তাকিয়ে থাকলে আমার চোখ কখন যেন খুলে যায়।

ইকবাল ওর হাত টা আমার গালে দিয়ে বলছে,গল্পের শেষ টা না শুনেই ঘুম?

আমি: উফ! হাত খুব ঠান্ডা।

ও হাত টা সরিয়ে নিল ভয়ে।

আমি ওর বুকে মাথা দিয়ে বললাম পুরো বিছানাটাই ঠান্ডা…

ও হেসে আমায় আরো শক্ত করে ধরলো..

আমি: আচ্ছা ছাড়ুন আমায়।
ইকবাল: কেন?

আমি: আমি কবুল পড়ে বিয়ে করিনি।পরমহিলাকে ছুঁতে নেই।

ইকবাল: পরমহিলা কি?

আমি: কেন পরপুরুষ এর স্ত্রী লিঙ্গ।

ইকবাল: হা হা হা।জানেন আমি বিয়ে পড়াতে জানি।

আমি: তাই?

ইকবাল: হুম।আসুন আমার বুকে আসুন।আমি বিয়ের দোয়া পড়ছি..

আমি ওর বুকে মাথা রাখলাম।
ও দোয়া পড়া শেষ করে বলছে বলুন বউ কবুল..

আমি: কবুল…কবুল..কবুল..

এক একবার কবুল এর সাথে সাথে ওর নিকটে আসা প্রবল হলো আর কমে যাচ্ছে শীতের মাত্রা।

সব বিয়ে শুরুতেই মনের বৈধতা দিয়ে হয়না।কিছু কিছু বিয়ে করার পর সম্পর্ক প্রবল শক্ত হয়ে যায়। বিয়ের এমন ই এক গুন আছে…যা খুব সহজে অবৈধতাকে বৈধ এর রূপ দিতে পারে…
*সমাপ্ত* লেখা: Umme Nipa

আপনার মন্তব্য দিন

শেয়ার