অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গা নারী হাসিনা: সাত দিন পায়ে হেঁটে যেভাবে পালিয়ে এলেন বাংলাদেশে

কটি বাঁশের লাঠি ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন হাসিনা বেগম। তিনি ছ’মাসের অন্তঃসত্বা।

টানা সাতদিন ধরে হাঁটছেন। পা ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। বলছিলেন আর পারছেন না এভাবে।
তার সাথে যখন আমার কথা হয় তখন পর্যন্ত পুরো চব্বিশ ঘন্টা তার পেটে দানাপানি পড়েনি।
আরো আটটি সন্তান রয়েছেন তার সঙ্গে। আর রয়েছেন স্বামী।
হাসিনা বেগম বলছিলেন, “কাজ করতে পারিনা, কিছু করতে পারিনা, তাই ঘরবাড়ি ফেলে রেখে আসছি”।
মিয়ানমারের সেনবাহিনী কি কোন নির্যাতন করেছে তাকে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “না। তবে সেনাবাহিনী বা স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা তাদের কোন কাজ দিচ্ছে না আর।”
তার স্বামী একজন রাজমিস্ত্রী। সেনাবাহিনী কিংবা বৌদ্ধদের বাড়িঘর ও প্রতিষ্ঠানেই একমাত্র তার কাজ করার সুযোগ ছিল।
কিন্তু দু’মাস ধরে কোন কাজ পাননি তার স্বামী।
তারা খাদ্যসঙ্কটে পড়ে গিয়েছিলেন।
তাদের দশজনের সংসার এবং অনাগত একজন রয়েছে পেটে, কিন্তু রোজগার নেই।
“খাদ্য যখন নেই, আমরা সেখানে কি করে থাকব? তাই নিরুপায় হয়ে পালিয়ে এসেছি”, বলছিলেন হাসিনা বেগম।

পালংখালির আনজুমপাড়া সীমান্তে হাসিনা বেগমের মতো আটকে আছেন আরও বহু শরণার্থী
হাসিনার মতো হাজার হাজার মানুষ গত সোমবার থেকে অপেক্ষা করছে পালংখালির আনজুমপাড়া সীমান্তের বাংলাদেশ অংশের শূন্য রেখা বরাবর।
তাদের সেখান থেকে আর এগোতে দিচ্ছে না বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি।
বলা হচ্ছে যাচাই-বাছাই হবে তাদের এবং তারপর রোহিঙ্গা শিবিরগুলো থেকে সেনাবাহিনীর নির্দেশনা এলেই তাদের এগোতে দেয়া হবে।
তারা খোলা আকাশের নিচে ধানক্ষেতের আলের উপর রয়েছেন।

মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা শিশুদের লেখাপড়া করবার ব্যবস্থা কী?
জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ বলছে, গত ২৫ শে অগাস্টের পর মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে যত রোহিঙ্গা শরণার্থী এসেছে তার ৬০% ই শিশু।

প্রাণ হাতে নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসার আগে এরা দমন পীড়নের যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছে, সেখানে বিনোদন, খেলাধুলা, শিক্ষা ইত্যাদির জায়গা কোথায়?
কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে ইউনিসেফ অবশ্য ২২৮টি লার্নিং সেন্টার করে ইংরেজি ও বার্মিজ ভাষায় রোহিঙ্গা শিশুদেরকে অনানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা দিচ্ছে।
কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের এরকম একটি লার্নিং সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, দল বেঁধে তারা গাইছে ‘উই শ্যাল ওভারকাম’।
পাহাড়ের উপরে সারি সারি পলিথিনে ছাওয়া বস্তিঘরের মাঝে এটি একটি অনানুষ্ঠানিক স্কুল।
এরপর তারা জনপ্রিয় সব ইংরেজি ছড়া সমস্বরে আবৃত্তি করল। অতঃপর তারা আবৃত্তি করলো আমার অজানা একটি ভাষায় কয়েকটি ছড়া।
উপস্থিত প্রশিক্ষক জানালেন, এগুলো বার্মিজ ভাষার ছড়া।
এই লার্নিং সেন্টারে, মূলত ইংরেজি, গণিত ও বার্মিজ ভাষা শিক্ষা দেয়া হয় বলে জানালেন সেন্টারটির প্রোগ্রাম অর্গানাইজার হুমায়ুন কবির।
এদেরকে এই বার্মিজ ভাষা শেখানোর জন্য শরণার্থী রোহিঙ্গাদের মধ্যে থেকেই বেছে নেয়া হয়েছে এই ভাষা জানা শিক্ষক।

অনেক শিশু এসেছে অন্য পরিবারের সাথে
প্রতিটি শিফটে ৩৫ জন শিশু। ৪ থেকে ৬ বছর বয়েসি এক দল। আরেক দল ৭ থেকে ১৪ বছর বয়েসিদের। প্রতিদিন তিনটি শিফটে মোট একশো পাঁচজন করে শিক্ষার্থীকে পাঠগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে এখানে।
এখানে পড়তে এসে কেমন লাগছে তাদের?
শিশুরা বাংলাতেই বললো, “ভাল লাগছে”।
অর্থাৎ এ কদিনে তারা সবার বোধগম্য বাংলাটাও শিখে গেছে। এতদিন তারা কথা বলত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের আঞ্চলিক ভাষায়।
ইউনিসেফ কর্মকর্তা ফারিয়া সেলিমের ভাষায়, শরণার্থীর কঠিন জীবনে এই লার্নিং সেন্টারগুলো হচ্ছে শিশুদের ‘ব্রিদিং স্পেস’ বা নিঃশ্বাস নেবার জায়গা।
সব মিলিয়ে ১৯ হাজার শরণার্থী শিশু এই লার্নিং সেন্টারগুলোতে শিক্ষা নেবার সুযোগ পাচ্ছে।
কিন্তু একটি বিরাট সংখ্যক শিশুই তাদের শরণার্থীর দিনগুলোতে কোনরকম কোন শিক্ষা পাচ্ছে না।
ইউনিসেফ অবশ্য বলছে, তারা আগামী ছ’মাসে লার্নিং সেন্টারের সংখ্যা ১৫শতে উন্নীত করতে চায়, যেখানে অন্তত দুই লাখ শিশু এই অনানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পাবে।
আর সেটা হলে হয়তো বেশীরভাগ রোহিঙ্গা শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা পাওয়ার বিষয়টি হয়তো নিশ্চিত হবে।

বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য আসলে কতটুকু করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়?
মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের যে ঢল নেমেছে বাংলাদেশে গত ২৫শে অগাস্ট থেকে সেটি এখন আন্তর্জাতিক বিশ্বে বড় খবরগুলোর একটি।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কয়েক দফা আলোচিত হয়েছে এবং সংস্থাটি বলেছে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি হলো ‘বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল শরণার্থী সংকট”।
তারা এটিকে জাতিগত নিধনের একটি উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করেছে।
জাতিসংঘের হিসেবে এ পর্যন্ত ৫ লাখ ৩৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে যার মধ্যে ৫৮% শিশু আর প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৬০শতাংশই নারী।
বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন করে আশ্রয় কেন্দ্র নির্মানের পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ।
আশ্রয় কেন্দ্রের বাইরে কক্সবাজার ও বান্দরবানের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা।
জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা পরিস্থিতির ভয়াবহতা বারবার তুলে ধরেছে গণমাধ্যমে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহবান জানিয়েছে দ্রুত এগিয়ে আসার জন্য।

জাতিসংঘের হিসেবে এ পর্যন্ত ৫ লাখ ৩৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে যার মধ্যে ৫৮% শিশু
কিন্তু কি কি প্রয়োজন রোহিঙ্গাদের ? কি বলছে আন্তর্জাতিক সংস্থা গুলো? কি এসেছে? কি বলছে আন্তর্জাতিক বিশ্ব?
•আগামী ৬ মাসে প্রয়োজন হবে জাতিসংঘের মানবিক সাহায্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজন ৪৩৪ মিলিয়ন ডলার
•৯ লাখ ডোজ কলেরা টিকা দেয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ
•অন্তত ১০ হাজার টয়লেট তৈরি করবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
• বাংলাদেশকে আরও আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে
•পাঁচশ টন সাহায্য এসেছে পাঁচটি বিশেষ বিমানে
•জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বারবার রোহিঙ্গাদের ওপর চরম নিষ্ঠুরতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে কিন্তু কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি
•যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে আইনের শাসনের প্রতি সম্মান জানাতে বলেছে যাতে সহিংসতা ও মানুষের বাস্তু চ্যুত হওয়া বন্ধ হয়
•চীন বলেছে জাতীয় উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীলতা রক্ষায় মিয়ানমার যে প্রচেষ্টা নিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত তাতে সমর্থন দেয়া
•যুক্তরাজ্যের দুর্যোগ বিষয়ক জরুরী কমিটি শরণার্থীদের জন্য তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী রাখাইনে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জন্য একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাতিল করেছে।

আপনার মন্তব্য দিন

শেয়ার